নগরের প্রাণকেন্দ্রে বস্তিবাসী: এক বাস্তবতা
ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের খোঁজে রাজধানীতে ভিড় করছে। কিন্তু বসবাসের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের অভাবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ ঠাঁই নিচ্ছে বস্তিতে। সম্প্রতি আইসিডিডিআরবি (ICDDRB)-এর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকার প্রায় ৪০% মানুষ বর্তমানে বস্তিতে বসবাস করে। এই বস্তিগুলোতে জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিম্ন, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাবার কিংবা নিরাপদ পানি পাওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।
দুধ: একটি মৌলিক পুষ্টির উৎস
দুধ শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টিকর খাদ্য। এতে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, বি-১২ এবং ফসফরাসের মতো উপাদান, যা হাড় গঠনে, মস্তিষ্কের বিকাশে এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য গড়ে ২৫০-৩০০ মিলিলিটার দুধ গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকে। কিন্তু এই মৌলিক চাহিদাটুকু পূরণ করতে পারছেন না ঢাকার অধিকাংশ নাগরিকই, বিশেষত বস্তিবাসীরা।
দুধপ্রাপ্তিতে বৈষম্য: আইসিডিডিআরবি-র উদ্বেগ
আইসিডিডিআরবি-র গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার বস্তিগুলোতে বসবাসরত পরিবারগুলোর ৭২% শিশু নিয়মিত দুধ পায় না। তাদের পরিবার দুধ কিনে খাওয়াতে অক্ষম, কারণ বাজারে এক লিটার দুধের দাম ৮০-১২০ টাকার মধ্যে হওয়ায় এটি তাদের সাধ্যের বাইরে চলে যায়। এ ছাড়া সংরক্ষণব্যবস্থা ও ঠান্ডা করার সুবিধার অভাবেও অনেক পরিবার দুধ কিনে রাখতে পারে না।
ঢাকাবাসীর দুধ গ্রহণের চিত্র
একাধিক পুষ্টি বিষয়ক গবেষণা বলছে, ঢাকা শহরের মাত্র ২৬% নাগরিক প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ গ্রহণ করেন। বাকিরা হয় অনিয়মিতভাবে গ্রহণ করেন অথবা সামান্য চা বা রান্নায় ব্যবহৃত দুধেই সীমাবদ্ধ থাকেন। বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েরা, গর্ভবতী মা ও শিশুদের মধ্যে এই ঘাটতি বেশি লক্ষ করা যায়। উচ্চবিত্ত শ্রেণি নিয়মিত দুধ গ্রহণ করতে পারলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণিতে তা অনেকটা বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়।
অর্থনৈতিক চাপে দুধের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ পরিবার
ঢাকায় বসবাসরত বহু পরিবারই মাসে ১৫-২০ হাজার টাকার মধ্যে চলার চেষ্টা করেন। এই আয়ের মধ্যে বাড়ি ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা খরচ মিটিয়ে আলাদাভাবে দুধ কিনে খাওয়ানো সম্ভব হয় না। বিশেষত, দুই বা ততোধিক সন্তানের পরিবারগুলোর জন্য এটি হয়ে দাঁড়ায় এক অসম্ভব দায়িত্ব। অনেক বাবা-মা বলেন, সন্তানকে একদিন পর পর আধা গ্লাস দুধ দেওয়া যায়—এটাই বড় পাওয়া।
শিশুদের পুষ্টির সংকট: ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের পর্যাপ্ত দুধ না পাওয়া মানে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়া। হাড়ের দুর্বলতা, দাঁতের সমস্যা, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, এমনকি অ্যানিমিয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে শিশু পুষ্টি ঘাটতির হার ৩৪% থেকে এখনো ২৮%-এর নিচে নামেনি। ঢাকার বস্তিতে জন্ম নেওয়া শিশুরা জন্ম থেকেই পিছিয়ে পড়ছে পুষ্টিক্ষেত্রে।
নীতিনির্ধারণে পরিবর্তনের প্রয়োজন
বিশ্লেষকদের মতে, দুধের প্রাপ্যতা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে হলে দরকার সরকারিভাবে ভর্তুকিভিত্তিক দুধ বিতরণ ব্যবস্থা। বস্তিগুলোতে ‘পুষ্টি বুথ’ বা ‘দুধ কেন্দ্র’ স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে কম দামে শিশুদের জন্য নিরাপদ দুধ সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য চালু করা যেতে পারে গণমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা।
উপসংহার: পুষ্টির অধিকার নিশ্চিতে দৃষ্টি দিন
ঢাকায় বসবাসরত কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুধের প্রাপ্তি ও গ্রহণের বিষয়টি। একটি শহর তখনই টেকসই ও মানবিক হয়ে ওঠে, যখন তার গরিব নাগরিকরাও মৌলিক পুষ্টির অধিকার পায়। সুতরাং এখনই সময়, দুধকে বিলাসিতা নয়—প্রত্যেক শিশুর জন্মগত অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার। না হলে ভবিষ্যতের প্রজন্ম শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে ক্ষীণ ও আর্থিকভাবে পরনির্ভর হয়ে পড়বে।