০৯:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬
ইরান যুদ্ধের বিরতি কি সাময়িক? সামনে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা জেডি ভ্যান্সের বার্তা: ‘অসাধারণ’ ব্রিটেনকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থ করেছে নেতৃত্ব খুলনায় গলাকাটা অবস্থায় ভ্যানচালকের মরদেহ উদ্ধার, হত্যার রহস্য খতিয়ে দেখছে পুলিশ নেতার শেষ বিদায়ে তেহরানে লাখো মানুষের ঢল, খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিকে ঘিরে শোক-রাজনীতির নতুন অধ্যায় মরক্কোর দাপটে বিদায় স্বাগতিক কানাডা, টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আফ্রিকার শক্তিশালী প্রতিনিধিরা বর্ষাতেও রংপুরে তাপপ্রবাহের দাপট, বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে জনদুর্ভোগ আমেরিকান স্বপ্ন: উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি থেকে কঠিন বাস্তবতার দীর্ঘ যাত্রা ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট কি এখন ভোটের আগেই নির্ধারিত হচ্ছে? মেক্সিকো: যেখানে ইতিহাসের পরাজয় ভেঙে নতুন গল্প লিখতে চায় ইংল্যান্ড বিচ্ছিন্নতাবাদী-সন্ত্রাসীদের হামলায় পাপুয়ায় মার্কিন পাইলট নিহত, তদন্তে ইন্দোনেশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সমন্বয়

অন্ধকারে দীপ্ত আলোর খোঁজে: এক বিধবার সংগ্রামের কাহিনি

জীবন শুরু আবার, স্বামীর মৃত্যুর পর

ফরিদপুর জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে বসবাস রওশন আরার। বয়স পঁইত্রিশ পেরিয়েছে মাত্র, কিন্তু তার মুখের রেখায় জীবনের অনেকটা পথ চলার ক্লান্তি ফুটে আছে। তিন বছর আগে হঠাৎ এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী হারান। স্বামী হারানোর শোক কাটিয়ে উঠার আগেই তাকে সামনে দাঁড়াতে হয় নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি—তিনটি সন্তান, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর নিঃসঙ্গ জীবনের লড়াই।

সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য মায়ের যুদ্ধ

রওশনের তিন সন্তান—নাবিল (১৩), তামান্না (৯) ও লুবনা (৬)। স্বামীর মৃত্যুর পর একেবারে আয়হীন হয়ে পড়লেও তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সন্তানদের শিক্ষার খরচ যেভাবেই হোক, চালিয়ে যাবেন। সকালবেলা তিনি গ্রামের হাটে সবজি বিক্রি করেন। দুপুরে স্থানীয় এক প্রাইমারি স্কুলে রান্নার কাজ করেন। আর বিকেলে ঘরে এসে নিজেই সন্তানদের পড়াশোনা দেখেন।

রওশন আরার কথায়, “আমি না খেয়ে থাকলেও মেনে নেব, কিন্তু ওদের লেখাপড়ায় যেন বাধা না আসে। এই স্বপ্নটা ধরে রেখেই বেঁচে আছি।”

সমাজের চোখ রাঙানি ও কুসংস্কারের দেয়াল

একজন একা নারী হিসেবে রওশনকে প্রতিদিনই লড়তে হয় সমাজের কটূ কথা, সন্দেহের চোখ ও অসংখ্য বাধার সঙ্গে। স্বামীহীন নারীর প্রতি গ্রামের কিছু পুরুষের কু-দৃষ্টির পাশাপাশি অনেক নারীও তাঁর সাহসিকতাকে দেখে ঈর্ষা করেন। কেউ বলেন, “একজন বিধবা এত ঘোরাঘুরি করে কেন?”, কেউ আবার সন্তানদের লেখাপড়াকে “অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা” বলে কটাক্ষ করেন।

কিন্তু রওশন বলেন, “আমি জানি, এই সমাজ এক বিধবার উঠে দাঁড়ানো সহজে মেনে নিতে চায় না। কিন্তু আমি থামব না।”

বাতিলের ঝুঁকিতে ২৫৮ এনজিও | প্রথম আলো

সরকারি সহায়তা নেই, এনজিওর দরজাও বন্ধ

তিনি কয়েকবার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বিধবা ভাতার জন্য আবেদন করেছেন, কিন্তু এখনো কোনো সাড়া পাননি। একাধিক এনজিওর দ্বারস্থ হয়েও ফিরে এসেছেন খালি হাতে। “বলে, আমার বয়স কম, এখনও কাজ করতে পারি, তাই সহায়তা পাওয়া যাবে না,” বলেন তিনি। অথচ এই সমাজেই অনেক প্রভাবশালী পরিবার দিনের পর দিন সরকারি সুযোগ ভোগ করছে, যাদের প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রয়োজন নেই।

আশার আলো: গ্রামের কয়েকজন তরুণ ও শিক্ষক

তবে হতাশার মাঝেও কিছু আশার আলো আছে। গ্রামের স্কুলের একজন শিক্ষক, মিজান স্যার, প্রায়ই রওশনের ছেলেমেয়েদের ফ্রি টিউশন দেন। এলাকার দুই তরুণ, জুয়েল ও সাবিনা, স্থানীয়ভাবে ছোট একটা “চাইল্ড সাপোর্ট ফান্ড” গড়ে তুলেছেন, যেখানে গ্রামের কিছু যুবক মাসে ২০-৩০ টাকা করে দিয়ে রওশনের মতো সংগ্রামী অভিভাবকদের সহায়তা করেন।

“রওশন আপা আমাদের চোখে একজন আসল হিরো,” বলেন জুয়েল।

এখনও কি সেলাই-ফোঁড়াইয়ের কাজ হয়! | The Business Standard

প্রতিজ্ঞা: সন্তানদের মানুষ করেই মরব

রওশন প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে ঘরের কোণে বসে সেলাইয়ের কাজ করেন। এটাই তার শেষ অবলম্বন—পৃথিবীর দিকে তিনটি শিশুকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা। “ওদের মানুষ করেই মরব। তবেই এই জীবনের কষ্ট স্বার্থক হবে,”—রওশনের কথায় দৃঢ় সংকল্প।

একটি প্রশ্ন রেখে যাই

আজ যখন সমাজ নারী ক্ষমতায়নের কথা বলে, তখন গ্রামবাংলার হাজারো রওশন আরা অবহেলিত থেকে যান কেবল বিধবা হওয়ার কারণে। এই বৈষম্য ভাঙবে কে? রাষ্ট্র, সমাজ, না আমরা—এই প্রশ্ন আমাদের সবার জন্য রেখে যান রওশন আরারা।

এই প্রতিবেদনটি একটি বাস্তবিক চিত্রের ওপর ভিত্তি করে রচিত, যেখানে নাম ও স্থান আংশিক পরিবর্তিত হয়েছে গোপনীয়তার স্বার্থে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধের বিরতি কি সাময়িক? সামনে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা

অন্ধকারে দীপ্ত আলোর খোঁজে: এক বিধবার সংগ্রামের কাহিনি

০৪:১০:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ জুলাই ২০২৫

জীবন শুরু আবার, স্বামীর মৃত্যুর পর

ফরিদপুর জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে বসবাস রওশন আরার। বয়স পঁইত্রিশ পেরিয়েছে মাত্র, কিন্তু তার মুখের রেখায় জীবনের অনেকটা পথ চলার ক্লান্তি ফুটে আছে। তিন বছর আগে হঠাৎ এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী হারান। স্বামী হারানোর শোক কাটিয়ে উঠার আগেই তাকে সামনে দাঁড়াতে হয় নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি—তিনটি সন্তান, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর নিঃসঙ্গ জীবনের লড়াই।

সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য মায়ের যুদ্ধ

রওশনের তিন সন্তান—নাবিল (১৩), তামান্না (৯) ও লুবনা (৬)। স্বামীর মৃত্যুর পর একেবারে আয়হীন হয়ে পড়লেও তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সন্তানদের শিক্ষার খরচ যেভাবেই হোক, চালিয়ে যাবেন। সকালবেলা তিনি গ্রামের হাটে সবজি বিক্রি করেন। দুপুরে স্থানীয় এক প্রাইমারি স্কুলে রান্নার কাজ করেন। আর বিকেলে ঘরে এসে নিজেই সন্তানদের পড়াশোনা দেখেন।

রওশন আরার কথায়, “আমি না খেয়ে থাকলেও মেনে নেব, কিন্তু ওদের লেখাপড়ায় যেন বাধা না আসে। এই স্বপ্নটা ধরে রেখেই বেঁচে আছি।”

সমাজের চোখ রাঙানি ও কুসংস্কারের দেয়াল

একজন একা নারী হিসেবে রওশনকে প্রতিদিনই লড়তে হয় সমাজের কটূ কথা, সন্দেহের চোখ ও অসংখ্য বাধার সঙ্গে। স্বামীহীন নারীর প্রতি গ্রামের কিছু পুরুষের কু-দৃষ্টির পাশাপাশি অনেক নারীও তাঁর সাহসিকতাকে দেখে ঈর্ষা করেন। কেউ বলেন, “একজন বিধবা এত ঘোরাঘুরি করে কেন?”, কেউ আবার সন্তানদের লেখাপড়াকে “অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা” বলে কটাক্ষ করেন।

কিন্তু রওশন বলেন, “আমি জানি, এই সমাজ এক বিধবার উঠে দাঁড়ানো সহজে মেনে নিতে চায় না। কিন্তু আমি থামব না।”

বাতিলের ঝুঁকিতে ২৫৮ এনজিও | প্রথম আলো

সরকারি সহায়তা নেই, এনজিওর দরজাও বন্ধ

তিনি কয়েকবার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বিধবা ভাতার জন্য আবেদন করেছেন, কিন্তু এখনো কোনো সাড়া পাননি। একাধিক এনজিওর দ্বারস্থ হয়েও ফিরে এসেছেন খালি হাতে। “বলে, আমার বয়স কম, এখনও কাজ করতে পারি, তাই সহায়তা পাওয়া যাবে না,” বলেন তিনি। অথচ এই সমাজেই অনেক প্রভাবশালী পরিবার দিনের পর দিন সরকারি সুযোগ ভোগ করছে, যাদের প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রয়োজন নেই।

আশার আলো: গ্রামের কয়েকজন তরুণ ও শিক্ষক

তবে হতাশার মাঝেও কিছু আশার আলো আছে। গ্রামের স্কুলের একজন শিক্ষক, মিজান স্যার, প্রায়ই রওশনের ছেলেমেয়েদের ফ্রি টিউশন দেন। এলাকার দুই তরুণ, জুয়েল ও সাবিনা, স্থানীয়ভাবে ছোট একটা “চাইল্ড সাপোর্ট ফান্ড” গড়ে তুলেছেন, যেখানে গ্রামের কিছু যুবক মাসে ২০-৩০ টাকা করে দিয়ে রওশনের মতো সংগ্রামী অভিভাবকদের সহায়তা করেন।

“রওশন আপা আমাদের চোখে একজন আসল হিরো,” বলেন জুয়েল।

এখনও কি সেলাই-ফোঁড়াইয়ের কাজ হয়! | The Business Standard

প্রতিজ্ঞা: সন্তানদের মানুষ করেই মরব

রওশন প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে ঘরের কোণে বসে সেলাইয়ের কাজ করেন। এটাই তার শেষ অবলম্বন—পৃথিবীর দিকে তিনটি শিশুকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা। “ওদের মানুষ করেই মরব। তবেই এই জীবনের কষ্ট স্বার্থক হবে,”—রওশনের কথায় দৃঢ় সংকল্প।

একটি প্রশ্ন রেখে যাই

আজ যখন সমাজ নারী ক্ষমতায়নের কথা বলে, তখন গ্রামবাংলার হাজারো রওশন আরা অবহেলিত থেকে যান কেবল বিধবা হওয়ার কারণে। এই বৈষম্য ভাঙবে কে? রাষ্ট্র, সমাজ, না আমরা—এই প্রশ্ন আমাদের সবার জন্য রেখে যান রওশন আরারা।

এই প্রতিবেদনটি একটি বাস্তবিক চিত্রের ওপর ভিত্তি করে রচিত, যেখানে নাম ও স্থান আংশিক পরিবর্তিত হয়েছে গোপনীয়তার স্বার্থে।