০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
জাপানে প্রাপ্তবয়স্ক দিবসের উৎসব, তরুণ কমলেও আশার আলো ছড়াচ্ছে নতুন প্রজন্ম “ভয়েস এআই বাজারে ডিপগ্রামের তেজি অগ্রযাত্রা” দাভোস সম্মেলনে নতুন বিশ্ব শৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনা সরকারের অনুমোদন: এক কোটি লিটার সয়াবিন তেল ও ৪০ হাজার মেট্রিক টন সার কেনা ইরানে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা তীব্র, নিহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজারে পৌঁছানোর আশঙ্কা গ্যাস সংকট ও চাঁদাবাজিতে রেস্তোরাঁ ব্যবসা চালানো হয়ে উঠছে অসম্ভব সস্তা চিনিযুক্ত পানীয় ও অ্যালকোহলে বাড়ছে অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি রাজধানীতে স্ত্রীকে বেঁধে জামায়াত নেতাকে হত্যা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রান্না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলা

অর্থঘাটতি ও পপুলিজম কীভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করে

অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর আপনার সামনে এক দশকের দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, মহামারি ও জ্বালানির অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের ধাক্কা এসে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ঋণের পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি)-এর চেয়েও বেশি, সুদের হার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, আর কেবল ঋণের সুদ পরিশোধেই রাজস্ব আয়ের বড় অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি কমছে না। যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ সরকারি বন্ড বাজারে ছাড়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চাহিদা মিটছে, ফলে আপনার দেশের বন্ড বিক্রি করতে হলে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। এদিকে জনতাবাদী দলগুলো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অর্থনীতির দৃষ্টিতে এখন ব্যয়সংকোচন জরুরি, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে এর বিপরীত।

ধনী দেশের সংকট

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)-এর দেশগুলোতে গড় বাজেট ঘাটতি গত বছর দাঁড়ায় জিডিপির ৪.৬ শতাংশে, যেখানে মহামারির আগের চার বছরে ছিল মাত্র ২.৯ শতাংশ। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে জিডিপির ৩.৩ শতাংশ, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা খাতে প্রত্যাশিত ব্যয়ের কাছাকাছি। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, মিতব্যয়ী নীতি সাধারণত নির্বাচনে বাধা নয়, কিন্তু ব্যয়সংকোচন বাড়ালে জনতাবাদী দলের উত্থান ঘটে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিতে এ প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। অর্থঘাটতি ও জনতাবাদের এই ঘূর্ণাবর্ত থেকে বের হওয়া কঠিন।

আর্থিক চাপ ও বন্ড বাজারের উদ্বেগ

২০০৭-০৯ সালের আর্থিক সংকটের পর অনেক সরকার ঋণ বাড়িয়ে ব্যয় চালিয়েছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন—ঋণ অনেক বেশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রানীতি কঠোর করছে। যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবছর প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের বন্ড বিক্রি করছে, ফলে সরকারকে আরও ক্রেতা খুঁজতে হচ্ছে। ফ্রান্সের ১০ বছরের বন্ডের মুনাফা এক দশক আগে যেখানে ১ শতাংশের নিচে ছিল, এখন তা ৩.৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেনও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের চাপে রাজনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

জনতাবাদী প্রতিশ্রুতি ও ঝুঁকি

ডানপন্থী জনতাবাদী দলগুলো সাধারণত বেশি সামাজিক ব্যয় ও কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়—যা বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ফ্রান্সে ২০২৪ সালের আগাম নির্বাচনের ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীরা জাতীয় র‍্যালি দলের উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়, ফলে ফরাসি ও জার্মান বন্ডের মুনাফার ব্যবধান বেড়ে যায়। সেপ্টেম্বরের আস্থাভোট ঘিরে এই ব্যবধান আবারও বাড়ছে।

ব্যয়সংকোচন বনাম জনতাবাদ

গবেষণায় দেখা যায়, ব্যয়সংকোচন হয়তো নির্বাচনের আগে সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মূলধারার রাজনীতির প্রতি সমর্থন কমিয়ে দেয়। ইউরোপে জনতাবাদের উত্থান প্রায়ই মিতব্যয়ী নীতির ঢেউয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইতালিতে স্থানীয় সরকার ব্যয়সংকোচনের ফলে ডানপন্থী দলের ভোট বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হওয়া বা রাস্তার দুরবস্থা থেকেও জনতাবাদী দলের সমর্থন বাড়ছে।

কর বৃদ্ধি নাকি ব্যয়সংকোচন

কিছু গবেষণায় দেখা যায়, কর বাড়ানো ব্যয়সংকোচনের মতো জনতাবাদ বাড়ায় না। তবে কর বৃদ্ধির নেতিবাচক দিক হলো এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে মুক্তবাজারমুখী দলগুলো কর বাড়ালে ভোটাররা বেশি ক্ষুব্ধ হয়।

বিকল্প পথ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা

আগে অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ইস্যু করে ঋণ নিয়ন্ত্রণ করত, যাতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়লেও সুদ তেমন না বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি বন্ড থেকে সরে এসেছে, ফলে ঋণ এখন স্বল্পমেয়াদি সুদের হারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অতীতে ইউরোপে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা আর্থিক দমননীতির মাধ্যমে ঋণ কমানো হয়েছে। এখন প্রবৃদ্ধি দুর্বল, ফলে দমননীতি ফের আলোচনায় আসছে। এর মধ্যে আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে সুদ না দেওয়া বা পেনশন তহবিলকে দেশীয় সম্পদে বিনিয়োগে বাধ্য করা।

আর্থিক দমননীতি ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া

এ ধরনের নীতি আসলে সঞ্চয়কারীদের ওপর চাপ, কারণ তারা কম মুনাফা পায়। আজকের দিনে অনেক বেশি মানুষ ব্যক্তিগত পেনশন ও সম্পদের মালিক। যদি তাদের সঞ্চয়ের অংশ সরকারকে কার্যত ছেড়ে দিতে হয়, তবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থঘাটতি ও পপুলিজম বা জনতাবাদ টানাপোড়েনে আটকে থাকা অর্থমন্ত্রীদের অবস্থা জটিল। ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জনতাবাদকে ঠেকানো—দুটোই একসঙ্গে করা প্রায় অসম্ভব। তবে সান্ত্বনা একটাই—যদি তিনি ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতা হারান, তাঁর উত্তরসূরী জনতাবাদী নেতাকেও একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপানে প্রাপ্তবয়স্ক দিবসের উৎসব, তরুণ কমলেও আশার আলো ছড়াচ্ছে নতুন প্রজন্ম

অর্থঘাটতি ও পপুলিজম কীভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করে

০৪:০৭:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫

অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর আপনার সামনে এক দশকের দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, মহামারি ও জ্বালানির অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের ধাক্কা এসে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ঋণের পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি)-এর চেয়েও বেশি, সুদের হার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, আর কেবল ঋণের সুদ পরিশোধেই রাজস্ব আয়ের বড় অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি কমছে না। যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ সরকারি বন্ড বাজারে ছাড়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চাহিদা মিটছে, ফলে আপনার দেশের বন্ড বিক্রি করতে হলে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। এদিকে জনতাবাদী দলগুলো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অর্থনীতির দৃষ্টিতে এখন ব্যয়সংকোচন জরুরি, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে এর বিপরীত।

ধনী দেশের সংকট

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)-এর দেশগুলোতে গড় বাজেট ঘাটতি গত বছর দাঁড়ায় জিডিপির ৪.৬ শতাংশে, যেখানে মহামারির আগের চার বছরে ছিল মাত্র ২.৯ শতাংশ। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে জিডিপির ৩.৩ শতাংশ, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা খাতে প্রত্যাশিত ব্যয়ের কাছাকাছি। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, মিতব্যয়ী নীতি সাধারণত নির্বাচনে বাধা নয়, কিন্তু ব্যয়সংকোচন বাড়ালে জনতাবাদী দলের উত্থান ঘটে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিতে এ প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। অর্থঘাটতি ও জনতাবাদের এই ঘূর্ণাবর্ত থেকে বের হওয়া কঠিন।

আর্থিক চাপ ও বন্ড বাজারের উদ্বেগ

২০০৭-০৯ সালের আর্থিক সংকটের পর অনেক সরকার ঋণ বাড়িয়ে ব্যয় চালিয়েছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন—ঋণ অনেক বেশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রানীতি কঠোর করছে। যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবছর প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের বন্ড বিক্রি করছে, ফলে সরকারকে আরও ক্রেতা খুঁজতে হচ্ছে। ফ্রান্সের ১০ বছরের বন্ডের মুনাফা এক দশক আগে যেখানে ১ শতাংশের নিচে ছিল, এখন তা ৩.৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেনও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের চাপে রাজনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

জনতাবাদী প্রতিশ্রুতি ও ঝুঁকি

ডানপন্থী জনতাবাদী দলগুলো সাধারণত বেশি সামাজিক ব্যয় ও কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়—যা বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ফ্রান্সে ২০২৪ সালের আগাম নির্বাচনের ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীরা জাতীয় র‍্যালি দলের উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়, ফলে ফরাসি ও জার্মান বন্ডের মুনাফার ব্যবধান বেড়ে যায়। সেপ্টেম্বরের আস্থাভোট ঘিরে এই ব্যবধান আবারও বাড়ছে।

ব্যয়সংকোচন বনাম জনতাবাদ

গবেষণায় দেখা যায়, ব্যয়সংকোচন হয়তো নির্বাচনের আগে সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মূলধারার রাজনীতির প্রতি সমর্থন কমিয়ে দেয়। ইউরোপে জনতাবাদের উত্থান প্রায়ই মিতব্যয়ী নীতির ঢেউয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইতালিতে স্থানীয় সরকার ব্যয়সংকোচনের ফলে ডানপন্থী দলের ভোট বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হওয়া বা রাস্তার দুরবস্থা থেকেও জনতাবাদী দলের সমর্থন বাড়ছে।

কর বৃদ্ধি নাকি ব্যয়সংকোচন

কিছু গবেষণায় দেখা যায়, কর বাড়ানো ব্যয়সংকোচনের মতো জনতাবাদ বাড়ায় না। তবে কর বৃদ্ধির নেতিবাচক দিক হলো এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে মুক্তবাজারমুখী দলগুলো কর বাড়ালে ভোটাররা বেশি ক্ষুব্ধ হয়।

বিকল্প পথ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা

আগে অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ইস্যু করে ঋণ নিয়ন্ত্রণ করত, যাতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়লেও সুদ তেমন না বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি বন্ড থেকে সরে এসেছে, ফলে ঋণ এখন স্বল্পমেয়াদি সুদের হারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অতীতে ইউরোপে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা আর্থিক দমননীতির মাধ্যমে ঋণ কমানো হয়েছে। এখন প্রবৃদ্ধি দুর্বল, ফলে দমননীতি ফের আলোচনায় আসছে। এর মধ্যে আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে সুদ না দেওয়া বা পেনশন তহবিলকে দেশীয় সম্পদে বিনিয়োগে বাধ্য করা।

আর্থিক দমননীতি ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া

এ ধরনের নীতি আসলে সঞ্চয়কারীদের ওপর চাপ, কারণ তারা কম মুনাফা পায়। আজকের দিনে অনেক বেশি মানুষ ব্যক্তিগত পেনশন ও সম্পদের মালিক। যদি তাদের সঞ্চয়ের অংশ সরকারকে কার্যত ছেড়ে দিতে হয়, তবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থঘাটতি ও পপুলিজম বা জনতাবাদ টানাপোড়েনে আটকে থাকা অর্থমন্ত্রীদের অবস্থা জটিল। ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জনতাবাদকে ঠেকানো—দুটোই একসঙ্গে করা প্রায় অসম্ভব। তবে সান্ত্বনা একটাই—যদি তিনি ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতা হারান, তাঁর উত্তরসূরী জনতাবাদী নেতাকেও একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।