০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা ইরানকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম বাড়ল, শেয়ারবাজারে পতন ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি: এডিবি বছরের শুরুতেই তাপমাত্রার রেকর্ড, উদ্বেগ বাড়ছে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে সংঘর্ষে ইসরায়েলি সেনা নিহত এআই দৌড়ে ডেটা চুক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা, বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের মাঝে খাবারের লড়াই, বৈরুতে রান্নাঘরে মানুষের পাশে মানুষ রেড সি ঝুঁকিতে জাহাজ ঘুরছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন চাপ ট্রাম্প-স্টারমার দ্বন্দ্বে নতুন উত্তাপ, ইরান ইস্যুতে জোটে ফাটল গভীর ইরানকে সতর্ক বার্তা ট্রাম্পের, চুক্তির সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে

সবচেয়ে বিপজ্জনক গ্রহাণুর খোঁজে অভিযান

হঠাৎ আতঙ্ক: পৃথিবীর পথে গ্রহাণু 2024 YR4

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নতুন এক মহাজাগতিক শিলার খোঁজ পান। এটি ছিল ১৩০ থেকে ৩০০ ফুট আকারের এক গ্রহাণু — যার ২০৩২ সালে পৃথিবীতে আঘাত হানার সম্ভাবনা দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। শুনতে সামান্য মনে হলেও, মহাকাশ বিজ্ঞানীদের জন্য এটি ছিল ভয়ংকর এক সতর্কবার্তা। এত বড় আকারের কোনো গ্রহাণুর পৃথিবীতে আঘাত হানার এমন উচ্চ সম্ভাবনা ইতিহাসে আগে ঘটেনি।

যদি গ্রহাণুটি জনবহুল শহর — যেমন মুম্বাই, লাগোস বা বোগোতায় পড়ত, সেক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অকল্পনীয় হতো। এ কারণেই জাতিসংঘ–সমর্থিত বিশেষজ্ঞরা পৃথিবী রক্ষার পরিকল্পনা নিয়ে জরুরি বৈঠক শুরু করেন — এটি কি মহাকাশযান দিয়ে ধাক্কা মেরে সরানো হবে, না কি পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা হবে?


আবিষ্কারের সূচনা: হাওয়াই থেকে বিশ্বজুড়ে সতর্কবার্তা

ডিসেম্বর ২৭, ২০২৪ সালে হাওয়াইয়ের অ্যাটলাস টেলিস্কোপ প্রথমবার ক্ষুদ্র আলোক বিন্দুর আকারে এই গ্রহাণুটিকে শনাক্ত করে। পরে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সহযোগিতায় গ্রহাণুটির পথনির্ণয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা, চিলি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার টেলিস্কোপগুলো একে একে এর গতিবিধি নিশ্চিত করে।

খুব দ্রুতই এটি যুক্ত হয় নাসার সেন্টার ফর নিয়ার আর্থ অবজেক্ট স্টাডিজের তালিকায়। স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার প্রোগ্রাম ‘সেন্ট্রি’ দেখায়, 2024 YR4–এর পৃথিবীতে আঘাত হানার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।

আকারের হিসাব: কত বড় বিপদ?

প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল এর আকার ৬৫ ফুট থেকে ৫০০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। ছোট হলে এটি বাতাসেই বিস্ফোরিত হতো, বড় হলে গোটা শহর নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।

পরবর্তীতে চিলির ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ দিয়ে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এর আকার ১৩০ থেকে ৩০০ ফুট। অর্থাৎ এটি যথেষ্ট বড় এবং বিপজ্জনক।


আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা ও গণমাধ্যমে সাড়া

জানুয়ারির শেষে আন্তর্জাতিক গ্রহাণু সতর্কতা নেটওয়ার্ক (IAWN) বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোকে বার্তা দেয় — পৃথিবীর জন্য এক বাস্তব ঝুঁকি আসছে। গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়তেই জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়।

কিন্তু সমস্যা ছিল, গ্রহাণুটি পৃথিবী থেকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছিল। একবার অদৃশ্য হয়ে গেলে অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত আবার দেখা যেত না।


প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা: পারমাণবিক অস্ত্র থেকে মহাকাশ মিশন

ফেব্রুয়ারির শুরুতে জাতিসংঘ–সমর্থিত স্পেস মিশন প্ল্যানিং অ্যাডভাইজরি গ্রুপ সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে বৈঠক করে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা আলোচনায় আসে, তবে এর রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি ছিল বিশাল।

তাই বিজ্ঞানীরা সঠিক হিসাব পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। ফেব্রুয়ারি ১৮ তারিখে আঘাত হানার সম্ভাবনা বেড়ে দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। ইতিহাসে এটাই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত।

নাটকীয় পালাবদল: হুমকি কেটে গেল

ফেব্রুয়ারি ১৯ থেকে নতুন পর্যবেক্ষণে দেখা গেল আঘাতের সম্ভাবনা কমছে। ফেব্রুয়ারি ২০ তারিখে জাপানের সুবারু টেলিস্কোপের তথ্য যোগ হওয়ার পর ঝুঁকি নেমে আসে ০.৩ শতাংশে।

শেষ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারি ২৪ তারিখে আন্তর্জাতিক সতর্কতা নেটওয়ার্ক ঘোষণা করে — গ্রহাণুটি পৃথিবীতে আঘাত হানবে না। এর সম্ভাবনা শূন্যে নেমে এসেছে।


 চাঁদের জন্য ঝুঁকি

তবে গল্প এখানেই শেষ হয়নি। মার্চে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) গ্রহাণুটিকে আবার পর্যবেক্ষণ করে। তাতে দেখা যায়, এর আকার প্রায় ২০০ ফুট। পৃথিবীর জন্য বিপদ নেই, তবে ২০৩২ সালে চাঁদে আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে ৪ শতাংশেরও বেশি।

যদি সেটি সত্যি হয়, তবে আঘাতের দৃশ্য পৃথিবী থেকেও খালি চোখে দেখা যাবে — চাঁদে সৃষ্টি হবে বিশাল এক গর্ত, আকাশে ছড়িয়ে পড়বে ধ্বংসাবশেষের ঝলকানি।

গ্রহাণু 2024 YR4 শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর জন্য হুমকি ছিল না। তবে এ অভিজ্ঞতা মহাকাশ প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের জন্য এক মহড়া হয়ে রইল। একদিন হয়তো সত্যিই বড় কোনো গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসবে। আর তখন এই অভিজ্ঞতাই মানবজাতিকে রক্ষায় কাজে লাগবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা ইরানকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে

সবচেয়ে বিপজ্জনক গ্রহাণুর খোঁজে অভিযান

১২:০২:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

হঠাৎ আতঙ্ক: পৃথিবীর পথে গ্রহাণু 2024 YR4

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নতুন এক মহাজাগতিক শিলার খোঁজ পান। এটি ছিল ১৩০ থেকে ৩০০ ফুট আকারের এক গ্রহাণু — যার ২০৩২ সালে পৃথিবীতে আঘাত হানার সম্ভাবনা দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। শুনতে সামান্য মনে হলেও, মহাকাশ বিজ্ঞানীদের জন্য এটি ছিল ভয়ংকর এক সতর্কবার্তা। এত বড় আকারের কোনো গ্রহাণুর পৃথিবীতে আঘাত হানার এমন উচ্চ সম্ভাবনা ইতিহাসে আগে ঘটেনি।

যদি গ্রহাণুটি জনবহুল শহর — যেমন মুম্বাই, লাগোস বা বোগোতায় পড়ত, সেক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অকল্পনীয় হতো। এ কারণেই জাতিসংঘ–সমর্থিত বিশেষজ্ঞরা পৃথিবী রক্ষার পরিকল্পনা নিয়ে জরুরি বৈঠক শুরু করেন — এটি কি মহাকাশযান দিয়ে ধাক্কা মেরে সরানো হবে, না কি পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা হবে?


আবিষ্কারের সূচনা: হাওয়াই থেকে বিশ্বজুড়ে সতর্কবার্তা

ডিসেম্বর ২৭, ২০২৪ সালে হাওয়াইয়ের অ্যাটলাস টেলিস্কোপ প্রথমবার ক্ষুদ্র আলোক বিন্দুর আকারে এই গ্রহাণুটিকে শনাক্ত করে। পরে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সহযোগিতায় গ্রহাণুটির পথনির্ণয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা, চিলি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার টেলিস্কোপগুলো একে একে এর গতিবিধি নিশ্চিত করে।

খুব দ্রুতই এটি যুক্ত হয় নাসার সেন্টার ফর নিয়ার আর্থ অবজেক্ট স্টাডিজের তালিকায়। স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার প্রোগ্রাম ‘সেন্ট্রি’ দেখায়, 2024 YR4–এর পৃথিবীতে আঘাত হানার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।

আকারের হিসাব: কত বড় বিপদ?

প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল এর আকার ৬৫ ফুট থেকে ৫০০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। ছোট হলে এটি বাতাসেই বিস্ফোরিত হতো, বড় হলে গোটা শহর নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।

পরবর্তীতে চিলির ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ দিয়ে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এর আকার ১৩০ থেকে ৩০০ ফুট। অর্থাৎ এটি যথেষ্ট বড় এবং বিপজ্জনক।


আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা ও গণমাধ্যমে সাড়া

জানুয়ারির শেষে আন্তর্জাতিক গ্রহাণু সতর্কতা নেটওয়ার্ক (IAWN) বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোকে বার্তা দেয় — পৃথিবীর জন্য এক বাস্তব ঝুঁকি আসছে। গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়তেই জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়।

কিন্তু সমস্যা ছিল, গ্রহাণুটি পৃথিবী থেকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছিল। একবার অদৃশ্য হয়ে গেলে অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত আবার দেখা যেত না।


প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা: পারমাণবিক অস্ত্র থেকে মহাকাশ মিশন

ফেব্রুয়ারির শুরুতে জাতিসংঘ–সমর্থিত স্পেস মিশন প্ল্যানিং অ্যাডভাইজরি গ্রুপ সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে বৈঠক করে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা আলোচনায় আসে, তবে এর রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি ছিল বিশাল।

তাই বিজ্ঞানীরা সঠিক হিসাব পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। ফেব্রুয়ারি ১৮ তারিখে আঘাত হানার সম্ভাবনা বেড়ে দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। ইতিহাসে এটাই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত।

নাটকীয় পালাবদল: হুমকি কেটে গেল

ফেব্রুয়ারি ১৯ থেকে নতুন পর্যবেক্ষণে দেখা গেল আঘাতের সম্ভাবনা কমছে। ফেব্রুয়ারি ২০ তারিখে জাপানের সুবারু টেলিস্কোপের তথ্য যোগ হওয়ার পর ঝুঁকি নেমে আসে ০.৩ শতাংশে।

শেষ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারি ২৪ তারিখে আন্তর্জাতিক সতর্কতা নেটওয়ার্ক ঘোষণা করে — গ্রহাণুটি পৃথিবীতে আঘাত হানবে না। এর সম্ভাবনা শূন্যে নেমে এসেছে।


 চাঁদের জন্য ঝুঁকি

তবে গল্প এখানেই শেষ হয়নি। মার্চে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) গ্রহাণুটিকে আবার পর্যবেক্ষণ করে। তাতে দেখা যায়, এর আকার প্রায় ২০০ ফুট। পৃথিবীর জন্য বিপদ নেই, তবে ২০৩২ সালে চাঁদে আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে ৪ শতাংশেরও বেশি।

যদি সেটি সত্যি হয়, তবে আঘাতের দৃশ্য পৃথিবী থেকেও খালি চোখে দেখা যাবে — চাঁদে সৃষ্টি হবে বিশাল এক গর্ত, আকাশে ছড়িয়ে পড়বে ধ্বংসাবশেষের ঝলকানি।

গ্রহাণু 2024 YR4 শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর জন্য হুমকি ছিল না। তবে এ অভিজ্ঞতা মহাকাশ প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের জন্য এক মহড়া হয়ে রইল। একদিন হয়তো সত্যিই বড় কোনো গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসবে। আর তখন এই অভিজ্ঞতাই মানবজাতিকে রক্ষায় কাজে লাগবে।