০২:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
ইউরোপের উদ্বেগে গ্রিনল্যান্ড, ট্রাম্পের দখল-আতঙ্ক ঠেকাতে মরিয়া কূটনীতি স্পেনের রাজনীতিতে বিচারকের ছায়া: ক্ষমতার লড়াইয়ে আদালত যখন বিতর্কের কেন্দ্রে ঘুম ঠিক রাখার এক অভ্যাসই বদলে দিতে পারে আপনার স্বাস্থ্য ইউরোপের নতুন ক্ষমতার রাজনীতি, লাতিন আমেরিকার সঙ্গে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি আইসিই কর্মকর্তার গুলিতে মৃত্যু: রেনে গুড মামলায় রাজ্য বনাম ফেডারেল আইনের মুখোমুখি সংঘাত বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার সম্ভাবনা এক শতাংশেরও কম শক্তিশালী কেনাবেচায় সপ্তাহের শুরুতে ডিএসই ও সিএসইতে বড় উত্থান ক্যাবিনেটে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়’ অধ্যাদেশের চূড়ান্ত খসড়া জমা কথা-কাটাকাটি থেকে গণপিটুনি, ঘটনাস্থলেই প্রাণ গেল মিজানুরের সাভারের পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে মিলল আরও দুই পোড়া মরদেহ

আমেরিকা ও চীন স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে: কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে কীভাবে এগোনো যায়

  • দা ওয়েই
  • ০৯:১৯:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫
  • 72

মার্কিন ও চীনা সম্পর্ক বারবার সংঘাত আর শিথিলতার দোলায় ঘোরার ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক যোগসূত্র এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল: অক্টোবরের শুরুতে, মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য-ঝড় দেখা গেল — নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আর শুল্ক বাড়ানোর হুঁশিয়ারি। তবু সম্পর্কের এই একদম নড়বড়ে সময়ে  নিস্তেজভাবে হলেও স্থিতিশীলতার লক্ষণও দেখায়। এপ্রিল-মে মাসের তীব্র উত্তেজনার পরে আপেক্ষিক শান্তি ফেরে; সংকট উঠলেই দুইপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি ঠেকাতে চেষ্টা করেছে। এই সব প্রমান করে যে দুটি বড় অর্থনীতির মধ্যে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার মৌলিক প্রয়োজন এখনও রয়েছে।

একটি মোড়ে দাঁড়ানো সম্পর্ক

এই দ্বৈত প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে মার্কিন–চীনা সম্পর্ক এখন একটি মোড়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটন বা বেইজিং—কেউই আশা করে না যে ২০১৭-এর আগের অবস্থা ফিরে আসবে; তখন পারস্পরিক নির্ভরতা ও সংলাপই মূল বৈশিষ্ট্য ছিল, বিচ্ছেদ বা কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। তবু সাম্প্রতিক স্বল্পকালীন বাণিজ্য-ঝগড়া ও কৌশলগত খেলা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এমন একটি সাধারণ স্তরে ফিরতে পারে—যেখানে তীব্র শত্রুতা না রেখেই তারা শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থা বজায় রাখতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সাক্ষাৎ এ সুযোগকে সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

আমেরিকা বনাম বিশ্ব — নয়ার দৃষ্টিভঙ্গি

এই মোড়টির একটি কারণ হলো মার্কিন বিদেশনীতিতে পরিবর্তন। বেইজিংয়ের চোখে, ট্রাম্পের প্রথম কার্যকালের শুরু থেকেই কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাজ করছে — তখন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে তাকে সীমিত করার চেষ্টা করেছিল। বাইডেন প্রশাসনও একই লক্ষ্য ধরে রেখেছিল, তবে মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার চেষ্টা করেছিল। ফলে বেইজিংয়ের কৌশলবিদরা মনে করে, ট্রাম্প-ও-বাইডেন উভয়েই চীনকে যে বড় হুমকি হিসেবে দেখে তা তাদের মধ্যে আপসের সুযোগ কমিয়ে দেয়।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদেও চীনের ওপর চাপ বজায় থাকলেও তাঁর নীতি বিশ্বব্যাপী পুনঃসামঞ্জস্য করেছে — অর্থাৎ নীতি এখন অনেক দেশকেই লক্ষ্য করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন সম্পর্কগুলোকে আলাদা রকমভাবে সাজিয়েছে। ফলে এটি আর কেবল ‘যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্র বনাম চীন’ নাও বলা যায়; বরং ‘যুক্তরাষ্ট্র বনাম পৃথিবীর বাকী অংশ’—এমন ছাপ রাখে।

গ্লোবালাইজেশনের পরে: কাঠামোগত পরিবর্তন

ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যায় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি কেবল প্রতিপক্ষের শত্রুপ্রবণ নীতির ফল বলে ধরা হয়; কিন্তু আরেকটি যুক্তি হলো—পুরনো গ্লোবালাইজেশনের মডেলই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিকীকরণের লাভান্বিত বণ্টন ও এর ফলে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ সমস্যা অনেক দেশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, এবং সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সহযোগিতার পুরনো ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

চীন বরাবরই পশ্চিমা উদারতন্ত্রের বাইরে একটি আলাদা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করেছে এবং তার দ্রুত উত্থান বহু বিষয়ে পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও গ্লোবালাইজেশন থেকে স্বীকৃত সুবিধার সঙ্গে নিজের অর্থনীতি ও সমাজে সৃষ্ট ক্ষত মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বাড়িয়েছে। ফলে এখন দু’পক্ষই পুরনো এককধারিত বিশ্বকে আর পুরোপুরি ধরে রাখতে চায় না; তাদের করণীয় হলো ডিগ্লোবালাইজেশনকে বোঝা ও তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

চীনের আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের নতুন উপায়

চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি ও শিল্পে অগ্রগতি করেছে; যদিও প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর, তবু অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও চীন নতুন প্রযুক্তিগত পথ খুঁজে নিয়েছে। বিশেষ করে রেয়ার আর্থের মতো সম্পদ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বেইজিংয়ের এখনও কিছু কৌশলগত কাজ আছে। এই আত্মবিশ্বাস চীনের নীতিনির্ধারকদের ঘরোয়া অর্থনীতি শক্ত করার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কতটুকু বাধা সৃষ্টি করে—এটা নিয়ে তারা আগের মতো বেশি চিন্তিত নাও হতে পারে।

পুনর্মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য সুযোগ

এই পটভূমিতে উভয় পক্ষের নীতিনির্ধারকরা পরস্পরকে কেমন দেখেন তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ পেয়েছেন। বেইজিং ভাবতে পারে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই চীনের উত্থান ঠেকাতে চায়? ওয়াশিংটনও ভাবতে পারে—চীন কি সত্যিই মার্কিন নেতৃত্ব উৎখাত করতে চায়? এই প্রশ্নগুলোর জবাবে যদি দু’পক্ষ আস্থা পুনর্নির্মাণের পথ খুঁজে পায়, তাহলে শত্রুতার ধারাটা কমে এসে সহযোগিতার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।

সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে বন্ধু হতে হবে না, তবে শত্রু থাকা উচিত নয়। নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়তে হলে তাদের পারস্পরিক নির্ভরতার ধাঁচটা নতুনভাবে সাজাতে হবে। দীর্ঘকাল সম্পর্কটি অসম ছিল: চীন আমেরিকান আর্থিক ব্যবস্থার ও উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে দ্রুত উন্নতি করেছে; যুক্তরাষ্ট্র চীনা উৎপাদনের ওপর ভর করে সস্তা পণ্য পেয়েছে। গত দশকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই পুরনো ধাঁচ ভেঙে দিয়েছে। এখন উভয়পক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কোথায় তারা একে অপরের ওপর নির্ভর করবে, আর কোথায় স্বতন্ত্র থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রিক যান ও ব্যাটারির মতো ক্ষেত্রে বড় চীনা বিনিয়োগ হলে উভয় দেশের মধ্যে আরও সমান নির্ভরতা গড়ে উঠতে পারে; কিন্তু এই বিনিয়োগগুলো সীমিত ও সম্মত খাতে হওয়া উচিত যাতে দু’পক্ষই লাভবান হয়।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত হিসাব

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কও পুনঃহিসাব করা দরকার। যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিতভাবে চীনের উপকূলের কাছে গোয়েন্দা অভিযান ও ‘নেভিগেশন ফ্রিডম’ অপারেশন চালায়—যা আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ড কখনো কখনো বিপজ্জনক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র যদি এসব রাজনৈতিকভাবে উস্কানিমূলক ক্রিয়াকলাপের মাত্রা কমায়, তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমতে পারে। বিকল্পভাবে, যুক্তরাষ্ট্র উপগ্রহসংক্রান্ত তথ্যের মত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামরিক গোয়েন্দা সংগ্রহ বাড়াতে পারে — যা সংঘাতের ঝুঁকি কমিয়ে তার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

তাইওয়ান ইস্যুতে উত্তেজনা কমানোও জরুরি। যদি মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের স্থায়ী স্বাধীনতার বিপক্ষে জোর দেয় এবং বেইজিংকে আশ্বস্ত করে, তাহলে বেইজিং সশস্ত্রবর্হিভোগ ও সামরিক মহড়ার সংখ্যা কমাতে পারে এবং দ্বিপক্ষীয় বিনিময় বাড়াতে পারে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা বাড়লে তাইওয়ান ইস্যুতে সামরিক রূপ নেয়ার তাগিদ কমে যাবে।

জাতীয়তাবাদ ওনয়ন: সমন্বয় না সংঘাত

১৯৯০-এর দশক থেকে সম্প্রতি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছিল; চীন তার জাতীয় নির্মাণে বেশি মনোযোগী ছিল। এখন, দীর্ঘদিন পর আবার দেখা যাচ্ছে—মার্কিন ও চীনা নীতিতে উভয় ক্ষেত্রেই শক্ত জাতীয়তাবাদ তুলে ধরা হচ্ছে: ট্রাম্পের “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” এবং শি জিনপিংয়ের “চীনের মহান পুনরুজ্জীবন”। এই জাতীয়তাবাদী লক্ষ্যগুলো অনিবার্যভাবে সংঘাতজনক হবে—এমনটা নয়। বরং উভয় দেশ পরোক্ষভাবে একে অপরের উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে, অথবা অন্তত একে অপরের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্থ না করাই তাদের নীতিগত প্রাধান্য হতে পারে। যখন একটি দেশ বেশি অভ্যন্তরীণ কাজে মনোযোগী হয়, তখন তা প্রায়ই পররাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে কড়া নাও হয়—এমন ঘটনার জোস দেখেছি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে  সা্উথ চায়না সি নীতিতে কিছু পরিবর্তনে।

একটি সম্ভাব্য পথ

নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন পুরোটাই একে অপরের অর্থনীতি ধ্বংস করতে পারবে; কিন্তু দু’পক্ষেরই এমন অর্থনৈতিক হাতিয়ার আছে যা অনিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিষ্ঠিত হলে বড় ক্ষতি করতে পারে। ট্রাম্প ও শি যখন আলোচনার টেবিলে বসবেন, তখন পরিস্থিতি একটি বদল ধরার সুযোগ প্রদর্শন করে—যা স্থিতিশীল ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকে একটি পথ খুলে দিতে পারে। এই পথ নিশ্চিত নয়, কিন্তু এটি সম্ভবপর এবং অনুসরণ করার যোগ্য লক্ষ্য।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোপের উদ্বেগে গ্রিনল্যান্ড, ট্রাম্পের দখল-আতঙ্ক ঠেকাতে মরিয়া কূটনীতি

আমেরিকা ও চীন স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে: কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে কীভাবে এগোনো যায়

০৯:১৯:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫

মার্কিন ও চীনা সম্পর্ক বারবার সংঘাত আর শিথিলতার দোলায় ঘোরার ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক যোগসূত্র এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল: অক্টোবরের শুরুতে, মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য-ঝড় দেখা গেল — নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আর শুল্ক বাড়ানোর হুঁশিয়ারি। তবু সম্পর্কের এই একদম নড়বড়ে সময়ে  নিস্তেজভাবে হলেও স্থিতিশীলতার লক্ষণও দেখায়। এপ্রিল-মে মাসের তীব্র উত্তেজনার পরে আপেক্ষিক শান্তি ফেরে; সংকট উঠলেই দুইপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি ঠেকাতে চেষ্টা করেছে। এই সব প্রমান করে যে দুটি বড় অর্থনীতির মধ্যে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার মৌলিক প্রয়োজন এখনও রয়েছে।

একটি মোড়ে দাঁড়ানো সম্পর্ক

এই দ্বৈত প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে মার্কিন–চীনা সম্পর্ক এখন একটি মোড়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটন বা বেইজিং—কেউই আশা করে না যে ২০১৭-এর আগের অবস্থা ফিরে আসবে; তখন পারস্পরিক নির্ভরতা ও সংলাপই মূল বৈশিষ্ট্য ছিল, বিচ্ছেদ বা কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। তবু সাম্প্রতিক স্বল্পকালীন বাণিজ্য-ঝগড়া ও কৌশলগত খেলা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এমন একটি সাধারণ স্তরে ফিরতে পারে—যেখানে তীব্র শত্রুতা না রেখেই তারা শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থা বজায় রাখতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সাক্ষাৎ এ সুযোগকে সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

আমেরিকা বনাম বিশ্ব — নয়ার দৃষ্টিভঙ্গি

এই মোড়টির একটি কারণ হলো মার্কিন বিদেশনীতিতে পরিবর্তন। বেইজিংয়ের চোখে, ট্রাম্পের প্রথম কার্যকালের শুরু থেকেই কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাজ করছে — তখন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে তাকে সীমিত করার চেষ্টা করেছিল। বাইডেন প্রশাসনও একই লক্ষ্য ধরে রেখেছিল, তবে মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার চেষ্টা করেছিল। ফলে বেইজিংয়ের কৌশলবিদরা মনে করে, ট্রাম্প-ও-বাইডেন উভয়েই চীনকে যে বড় হুমকি হিসেবে দেখে তা তাদের মধ্যে আপসের সুযোগ কমিয়ে দেয়।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদেও চীনের ওপর চাপ বজায় থাকলেও তাঁর নীতি বিশ্বব্যাপী পুনঃসামঞ্জস্য করেছে — অর্থাৎ নীতি এখন অনেক দেশকেই লক্ষ্য করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন সম্পর্কগুলোকে আলাদা রকমভাবে সাজিয়েছে। ফলে এটি আর কেবল ‘যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্র বনাম চীন’ নাও বলা যায়; বরং ‘যুক্তরাষ্ট্র বনাম পৃথিবীর বাকী অংশ’—এমন ছাপ রাখে।

গ্লোবালাইজেশনের পরে: কাঠামোগত পরিবর্তন

ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যায় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি কেবল প্রতিপক্ষের শত্রুপ্রবণ নীতির ফল বলে ধরা হয়; কিন্তু আরেকটি যুক্তি হলো—পুরনো গ্লোবালাইজেশনের মডেলই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিকীকরণের লাভান্বিত বণ্টন ও এর ফলে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ সমস্যা অনেক দেশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, এবং সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সহযোগিতার পুরনো ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

চীন বরাবরই পশ্চিমা উদারতন্ত্রের বাইরে একটি আলাদা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করেছে এবং তার দ্রুত উত্থান বহু বিষয়ে পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও গ্লোবালাইজেশন থেকে স্বীকৃত সুবিধার সঙ্গে নিজের অর্থনীতি ও সমাজে সৃষ্ট ক্ষত মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বাড়িয়েছে। ফলে এখন দু’পক্ষই পুরনো এককধারিত বিশ্বকে আর পুরোপুরি ধরে রাখতে চায় না; তাদের করণীয় হলো ডিগ্লোবালাইজেশনকে বোঝা ও তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

চীনের আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের নতুন উপায়

চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি ও শিল্পে অগ্রগতি করেছে; যদিও প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর, তবু অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও চীন নতুন প্রযুক্তিগত পথ খুঁজে নিয়েছে। বিশেষ করে রেয়ার আর্থের মতো সম্পদ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বেইজিংয়ের এখনও কিছু কৌশলগত কাজ আছে। এই আত্মবিশ্বাস চীনের নীতিনির্ধারকদের ঘরোয়া অর্থনীতি শক্ত করার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কতটুকু বাধা সৃষ্টি করে—এটা নিয়ে তারা আগের মতো বেশি চিন্তিত নাও হতে পারে।

পুনর্মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য সুযোগ

এই পটভূমিতে উভয় পক্ষের নীতিনির্ধারকরা পরস্পরকে কেমন দেখেন তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ পেয়েছেন। বেইজিং ভাবতে পারে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই চীনের উত্থান ঠেকাতে চায়? ওয়াশিংটনও ভাবতে পারে—চীন কি সত্যিই মার্কিন নেতৃত্ব উৎখাত করতে চায়? এই প্রশ্নগুলোর জবাবে যদি দু’পক্ষ আস্থা পুনর্নির্মাণের পথ খুঁজে পায়, তাহলে শত্রুতার ধারাটা কমে এসে সহযোগিতার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।

সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে বন্ধু হতে হবে না, তবে শত্রু থাকা উচিত নয়। নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়তে হলে তাদের পারস্পরিক নির্ভরতার ধাঁচটা নতুনভাবে সাজাতে হবে। দীর্ঘকাল সম্পর্কটি অসম ছিল: চীন আমেরিকান আর্থিক ব্যবস্থার ও উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে দ্রুত উন্নতি করেছে; যুক্তরাষ্ট্র চীনা উৎপাদনের ওপর ভর করে সস্তা পণ্য পেয়েছে। গত দশকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই পুরনো ধাঁচ ভেঙে দিয়েছে। এখন উভয়পক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কোথায় তারা একে অপরের ওপর নির্ভর করবে, আর কোথায় স্বতন্ত্র থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রিক যান ও ব্যাটারির মতো ক্ষেত্রে বড় চীনা বিনিয়োগ হলে উভয় দেশের মধ্যে আরও সমান নির্ভরতা গড়ে উঠতে পারে; কিন্তু এই বিনিয়োগগুলো সীমিত ও সম্মত খাতে হওয়া উচিত যাতে দু’পক্ষই লাভবান হয়।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত হিসাব

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কও পুনঃহিসাব করা দরকার। যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিতভাবে চীনের উপকূলের কাছে গোয়েন্দা অভিযান ও ‘নেভিগেশন ফ্রিডম’ অপারেশন চালায়—যা আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ড কখনো কখনো বিপজ্জনক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র যদি এসব রাজনৈতিকভাবে উস্কানিমূলক ক্রিয়াকলাপের মাত্রা কমায়, তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমতে পারে। বিকল্পভাবে, যুক্তরাষ্ট্র উপগ্রহসংক্রান্ত তথ্যের মত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামরিক গোয়েন্দা সংগ্রহ বাড়াতে পারে — যা সংঘাতের ঝুঁকি কমিয়ে তার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

তাইওয়ান ইস্যুতে উত্তেজনা কমানোও জরুরি। যদি মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের স্থায়ী স্বাধীনতার বিপক্ষে জোর দেয় এবং বেইজিংকে আশ্বস্ত করে, তাহলে বেইজিং সশস্ত্রবর্হিভোগ ও সামরিক মহড়ার সংখ্যা কমাতে পারে এবং দ্বিপক্ষীয় বিনিময় বাড়াতে পারে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা বাড়লে তাইওয়ান ইস্যুতে সামরিক রূপ নেয়ার তাগিদ কমে যাবে।

জাতীয়তাবাদ ওনয়ন: সমন্বয় না সংঘাত

১৯৯০-এর দশক থেকে সম্প্রতি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছিল; চীন তার জাতীয় নির্মাণে বেশি মনোযোগী ছিল। এখন, দীর্ঘদিন পর আবার দেখা যাচ্ছে—মার্কিন ও চীনা নীতিতে উভয় ক্ষেত্রেই শক্ত জাতীয়তাবাদ তুলে ধরা হচ্ছে: ট্রাম্পের “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” এবং শি জিনপিংয়ের “চীনের মহান পুনরুজ্জীবন”। এই জাতীয়তাবাদী লক্ষ্যগুলো অনিবার্যভাবে সংঘাতজনক হবে—এমনটা নয়। বরং উভয় দেশ পরোক্ষভাবে একে অপরের উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে, অথবা অন্তত একে অপরের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্থ না করাই তাদের নীতিগত প্রাধান্য হতে পারে। যখন একটি দেশ বেশি অভ্যন্তরীণ কাজে মনোযোগী হয়, তখন তা প্রায়ই পররাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে কড়া নাও হয়—এমন ঘটনার জোস দেখেছি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে  সা্উথ চায়না সি নীতিতে কিছু পরিবর্তনে।

একটি সম্ভাব্য পথ

নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন পুরোটাই একে অপরের অর্থনীতি ধ্বংস করতে পারবে; কিন্তু দু’পক্ষেরই এমন অর্থনৈতিক হাতিয়ার আছে যা অনিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিষ্ঠিত হলে বড় ক্ষতি করতে পারে। ট্রাম্প ও শি যখন আলোচনার টেবিলে বসবেন, তখন পরিস্থিতি একটি বদল ধরার সুযোগ প্রদর্শন করে—যা স্থিতিশীল ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকে একটি পথ খুলে দিতে পারে। এই পথ নিশ্চিত নয়, কিন্তু এটি সম্ভবপর এবং অনুসরণ করার যোগ্য লক্ষ্য।