স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের চারপাশে জমে থাকা মামলার পাহাড় নতুন বছরে দেশটির রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। নতুন বছরের ঠিক আগের রাতে এক সংবাদপত্র পূর্বাভাস দিয়েছিল, দুই হাজার ছাব্বিশ সাল হতে যাচ্ছে তাঁর জন্য বিচারিক ক্রুশ যাত্রার বছর। দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত, সাবেক কৌঁসুলি প্রধানের সাজা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ—সব মিলিয়ে স্পেনের বিচারব্যবস্থা এখন সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে।
বিচারিক তদন্তের ঘূর্ণাবর্তে সরকার
পেদ্রো সানচেজের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে অন্তত অর্ধডজন দুর্নীতি তদন্ত চলছে। এর পাশাপাশি দেশটির সাংবিধানিক আদালতে উঠতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ আপিল, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের রায় চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। সেই রায়ে সাবেক কৌঁসুলি প্রধান আলভারো গার্সিয়া অর্তিজকে এক বিরোধী রাজনীতিকের সঙ্গীর করসংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সানচেজের স্ত্রী বেগোনিয়া গোমেস ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধেও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে, যদিও দুজনই নিজেদের নির্দোষ দাবি করছেন।

সরকারের অভিযোগ, এগুলো আসলে একটি সুপরিকল্পিত বিচারিক হয়রানি, যার লক্ষ্য নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা। গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছিলেন, দেশে এমন বিচারক রয়েছেন যারা রাজনীতির চর্চা করছেন। অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, আদালত কেবল আইন প্রয়োগ করছে এবং যে জবাবদিহিতা সরকার ও ক্ষমতাসীন দল নিজেরা নিশ্চিত করতে পারছে না, সেটিই আদালত করছে।
বিরোধী রাজনীতি ও আদালতের উপর নির্ভরতা
রক্ষণশীল পিপলস পার্টির সংসদে সরকার পতনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলটি অনেক সময় আদালতের ওপর নির্ভর করেই সরকারের বিরুদ্ধে চাপ তৈরি করতে চাইছে। এই পরিস্থিতি স্পেনের গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বিচারব্যবস্থা ক্রমেই রাজনৈতিক ফুটবলে পরিণত হচ্ছে।
রাজনৈতিক রঙে রাঙানো বিচারব্যবস্থা

স্পেনের বহু নাগরিক মনে করেন, বিচারকদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও প্রকাশ্য ও তীব্র হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে বিচারকদের প্রগতিশীল কিংবা রক্ষণশীল বলে চিহ্নিত করা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা, যা পশ্চিম ইউরোপে খুবই বিরল। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীলদের প্রাধান্য, আর সাংবিধানিক আদালতে তুলনামূলকভাবে প্রগতিশীলদের আধিপত্য। এই দুই আদালতের মধ্যে মতবিরোধ প্রায়ই প্রকাশ্যে চলে আসছে।
আরও একটি ব্যতিক্রমী দিক হলো, স্পেনে একাধিক বিচারিক সমিতি রয়েছে, যেগুলো রাজনৈতিক বিভাজনের রেখায় বিভক্ত। গত জুলাইয়ে পাঁচটি সমিতি টানা তিন দিন ধর্মঘট করেছিল, যা দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিচারকদের দাবি ছিল, নতুন কিছু আইন বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশ্বাস ভাঙনের পেছনের কারণ
রাজনীতিক ও বিচারকদের মধ্যে এই গভীর অবিশ্বাসের পেছনে কয়েকটি বড় ঘটনা রয়েছে। প্রথমত, বিচারক নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ বিচার পরিষদ নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা। বিচারকরা মনোনীত করলেও সংসদের অনুমোদন লাগে। আগে সমাজতান্ত্রিক দল ও পিপলস পার্টির সমঝোতায় নিয়মিত এই পরিষদ নবায়ন হতো। কিন্তু দুই হাজার আঠারো সালের পর থেকে সেই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় কমিশনের মধ্যস্থতায় দুই হাজার চব্বিশ সালে সমাধানের চেষ্টা হয়।

দ্বিতীয়ত, কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক দলের সমঝোতা। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও, কাতালান নেতাদের জন্য ব্যাপক সাধারণ ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সানচেজ সরকার টিকিয়ে রাখেন। দুই হাজার সতেরো সালের অবৈধ বিচ্ছিন্নতাবাদী গণভোটে জড়িতদের জন্য এই সাধারণ ক্ষমা আগে সমাজতান্ত্রিক দলই বিরোধিতা করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট, যারা নয়জন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়েছিল, এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের প্রতি অপমান হিসেবে দেখেছে। এর ওপর সংসদীয় তদন্তের প্রতিশ্রুতি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের বিরুদ্ধে মামলাগুলো। এক সহকারী বিচারক, যিনি কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেন, সেখানে কিছু অনৈতিক আচরণের ইঙ্গিত মিললেও বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে সেগুলো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। তবু তদন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং আলোচনার কেন্দ্রে থেকে যাচ্ছেন ওই বিচারক।

ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগ
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এমন বিচারক খুবই সংখ্যালঘু। সাবেক সমাজতান্ত্রিক বিচারমন্ত্রী তোমাস দে লা কুয়াদ্রা সালসেদোর বক্তব্য, বিচারকরা দলগুলোর ইচ্ছা মত কাজ করছেন না। তবে বর্তমান উত্তপ্ত পরিবেশে তাঁদের ব্যক্তিগত পক্ষপাত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। দুর্নীতির অন্য তদন্তগুলোকে খুব কম মানুষই প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন।
আইনের শাসনের পক্ষে কাজ করা এলিসা দে লা নুয়েজ বলেন, বিচারব্যবস্থা সরকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট—এমন দাবি সত্য নয়। তবে তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া উদ্বেগজনক, কারণ এই প্রথম বিচারকরা মনে করছেন রাজনৈতিক ক্ষমতা তাঁদের হুমকি দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনীতিকদেরই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে এবং রাজনীতিকে বিচারিক লড়াইয়ে টেনে আনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু স্পেনের রাজনীতি যেভাবে তীব্রভাবে মেরুকৃত হয়ে উঠেছে, সেখানে সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়া সহজ নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















