প্রতিদিন সকালে নতুন নতুন হুমকির খবর নিয়ে ঘুম ভাঙলে সমাধান ভাবা সহজ নয়। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এমনই মন্তব্য করেন ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন। ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পর তার এই বক্তব্য ইউরোপজুড়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি। ভেনেজুয়েলার শাসককে যুক্তরাষ্ট্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনার পর আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে না এলে তা গ্রহণযোগ্য নয়, নইলে দ্বীপটি রাশিয়া বা চীনের প্রভাবের মধ্যে পড়বে।
ডেনমার্ক ও গ্রীনল্যান্ডের অবস্থান
ডেনমার্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের মর্যাদা নিয়ে কোনো আপসের প্রশ্ন নেই। স্বশাসিত এই অঞ্চলটি ডেনমার্কের অংশ এবং সে অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে ইউরোপের রাজধানী গুলোতে শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ন্যাটো মিত্র দেশের ভূখণ্ড নিয়ে এমন মন্তব্যকে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প আসলে কী চান, তা স্পষ্ট নয়। গ্রিনল্যান্ড বাসীকে আলাদা করতে চান, না কি অর্থ দিয়ে কিনতে চান, নাকি সামরিক পদক্ষেপের কথাও ভাবছেন—এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে ইউরোপীয় রাজনীতিতে।

চাপ কমানোর ইউরোপীয় চেষ্টা
প্রথম ধাপে ইউরোপ চেষ্টা করছে ট্রাম্পের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগকে বিদ্যমান চুক্তির ভেতরেই সমাধানযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে। আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি কাজের দল গঠনের ঘোষণা এসেছে। ন্যাটোর ভেতরে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি আর্কটিক অঞ্চলে নৌ নজরদারি জোরদারের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক ভাষায় ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে যে উত্তরের নিরাপত্তা নিয়ে তার উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক নয়।
বাস্তবতা কী বলছে
তবে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা যুক্তি বিশেষভাবে শক্ত নয়। ডেনমার্কের সঙ্গে উনিশশ একান্ন সালের চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সেখানে বড় পরিসরে সেনা মোতায়েন করতে পারে। বর্তমানে একটি ঘাঁটিতে দুই শতাধিকের কম সেনা রয়েছে। গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া বা চীনের জাহাজে গ্রিনল্যান্ডের জলসীমা ভরে গেছে—এমন দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ নেই। খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা ভিন্ন। বিরল খনিজ উত্তোলন ব্যয়বহুল, আর সার্বভৌমত্ব বদল ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান চাইলে বিনিয়োগ করতে পারে। তবু আগ্রহ খুব সীমিত।

ট্রাম্পের লক্ষ্য ও ইউরোপের দ্বিতীয় পথ
এই যুক্তিগুলো ট্রাম্পকে বিশেষ নড়াচড়া করাতে পারছে না। ইউরোপের অনেক কূটনীতিক মনে করছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের চিন্তা ট্রাম্পের উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার অংশ। তাই দ্বিতীয় পথে হাঁটার কথা ভাবছে ইউরোপ, যেখানে মূল লক্ষ্য হবে সম্ভাব্য দখল ঠেকানো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির কিছু অংশ স্থগিত করা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি খাতের ওপর চাপ বাড়ানোর কথাও আলোচনায় আছে। তবে এসব পদক্ষেপ কার্যকর সমর্থন পাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
সামরিক ও রাজনৈতিক সংকেত
ওয়াশিংটনের বৈঠকের দিনই ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডে নৌ, বিমান ও স্থল উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইডেন সমর্থনের কথা জানায়। এই পদক্ষেপ প্রতীকী হলেও বার্তাটি স্পষ্ট। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, এমন উদ্যোগ নজিরবিহীন পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীও এখন বলছেন, গ্রিনল্যান্ডে আঘাত মানে ন্যাটোর ভাঙন। জার্মানির সাবেক শীর্ষ নেতা সতর্ক করেছেন, এতে রাশিয়াও সাহস পেতে পারে।

ভয় ও দ্বিধা
তবে সবাই এই কঠোর অবস্থানের পক্ষে নয়। কেউ কেউ মনে করেন, উত্তেজনা বাড়ালে ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব আরও তীব্র হতে পারে। ইউক্রেন ইস্যুতেও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই অনেক ইউরোপীয় নেতা এখনো মনে করছেন, বিদ্যমান চুক্তির মধ্যেই সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে তা বোঝানো যাবে।
শেষ আশার দৃষ্টি
সবশেষে ইউরোপের একটি আশা হলো, ট্রাম্প হয়তো অন্য কোনো ইস্যুতে মনোযোগ সরিয়ে নেবেন। গোপন কৌশলে গ্রিনল্যান্ডে প্রভাব বিস্তার বা সামরিক পদক্ষেপ—দুটোই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এ নিয়ে সমর্থন সীমিত। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচনসহ নানা চাপ রয়েছে ট্রাম্পের ওপর। তাই ইউরোপের ধারণা, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই উচ্চস্বরে কথা বার্তা হয়তো শেষ পর্যন্ত দরকষাকষির কৌশল হিসেবেই থেকে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















