জঙ্গিবিরোধী অভিযানে এক দশকের মধ্যে সর্বাধিক ক্ষতি
অক্টোবর ২০২৫ মাসে পাকিস্তানে জঙ্গিদের ওপর চালানো অভিযানে গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। ইসলামাবাদভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক Pakistan Institute for Conflict and Security Studies (PICSS)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করায় জঙ্গিদের ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
অক্টোবর মাসের পরিসংখ্যান
পিআইসিএসএস-এর মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসে মোট ৩৫৫ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। একই সময়ে ৭২ জন নিরাপত্তাকর্মী ও ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান, যার মধ্যে একজন ছিলেন বান্নুর শান্তি কমিটির সদস্য।
এ ছাড়া, দেশজুড়ে আহত হন ৯২ জন নিরাপত্তাকর্মী, ৪৮ জন বেসামরিক নাগরিক ও ২২ জন জঙ্গি।
যদিও সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবর মাসে হামলার সংখ্যা ২৯ শতাংশ বেড়ে ৮৯–এ দাঁড়ায়, তবু এসব হামলায় নিহতের সংখ্যা ১৯ শতাংশ হ্রাস পায়।

অপহরণের রেকর্ড ও গ্রেফতার
অক্টোবর মাসে জঙ্গিদের হাতে ৫৫ জন মানুষ অপহৃত হয়েছেন, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক সংখ্যা। নিরাপত্তা বাহিনী এই সময় ২২ জন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে আটক করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জঙ্গিদের চালানো হামলাগুলোতে নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৫৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, ২৯ জন বেসামরিক নাগরিক, একজন শান্তি কমিটির সদস্য এবং ২৪ জন জঙ্গি। এসব হামলায় আহত হন আরও ৮৮ জন নিরাপত্তাকর্মী, ৪৫ জন বেসামরিক নাগরিক ও একজন জঙ্গি।
বেলুচিস্তানে পরিস্থিতির উন্নতি
বেলুচিস্তানে অক্টোবর মাসে ২৩টি জঙ্গি হামলা রেকর্ড করা হয়, যা সেপ্টেম্বরের ২১টি হামলার তুলনায় সামান্য বেশি। তবে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেপ্টেম্বর মাসে যেখানে ৩৩ জন নিরাপত্তাকর্মী ও ৩৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলেন, সেখানে অক্টোবর মাসে নিহত হন ১৬ জন নিরাপত্তাকর্মী ও ৩ জন বেসামরিক নাগরিক।
অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা অভিযানে ৬৭ জন জঙ্গি নিহত হয়—যা ২০০৪ সালের পর বেলুচিস্তানে এক মাসে সর্বোচ্চ জঙ্গি হতাহতের সংখ্যা। পিআইসিএসএস এই পরিস্থিতিকে প্রদেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার “উল্লেখযোগ্য উন্নতি” বলে অভিহিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসামরিক মৃত্যুর হার ৯২ শতাংশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মৃত্যুর হার ৫২ শতাংশ কমেছে।
![]()
উপজাতি এলাকায় সহিংসতা ও বড় অভিযান
পূর্বের ফেডারেল প্রশাসনিক উপজাতি এলাকায় (এফএটিএ) অক্টোবর মাসে ২২টি জঙ্গি হামলা রেকর্ড করা হয়—যা সেপ্টেম্বরের সমান। তবে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
মোট ৩১ জন নিহত হয়েছেন—যার মধ্যে ১৮ জন নিরাপত্তাকর্মী ও ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক। আহত হয়েছেন আরও ৪৫ জন।
এ অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে ২০৯ জন জঙ্গি—যা নভেম্বর ২০১৪ সালের পর এক মাসে সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সঙ্গে অভিযানে ১৬ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। ওরাকজাই জেলায় সংঘটিত এক ভয়াবহ ঘটনায় আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের মধ্যে ছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সাবেক উপপ্রধান ও ছায়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্বারি আমজাদের মৃত্যু। বাজৌরে নিহত এই ক্বারি আমজাদ ছিলেন ২০০৭ সালে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে উচ্চপ্রোফাইল নেতাদের একজন।

খাইবার পাখতুনখোয়া ও সিন্ধে হামলা
খাইবার পাখতুনখোয়ায় অক্টোবর মাসে ৩৭টি জঙ্গি হামলা হয়, যেখানে সেপ্টেম্বর মাসে হয়েছিল ২৫টি। এতে মোট ৪৮ জন নিহত হন—যার মধ্যে ২১ জন নিরাপত্তাকর্মী, ১০ জন বেসামরিক, ১৬ জন জঙ্গি ও একজন শান্তি কমিটির সদস্য। আহত হন ৪২ জন, যাদের মধ্যে ৩৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে আরও ৫৫ জন জঙ্গি নিহত হয়।
সিন্ধ প্রদেশে তিনটি জঙ্গি হামলায় ৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ৭ জন আহত হন, যার মধ্যে ৪ জন বেসামরিক ও ৩ জন নিরাপত্তাকর্মী।
নতুন হুমকি: জাইনাবিয়ুন ব্রিগেড
পিআইসিএসএস জানায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জাইনাবিয়ুন ব্রিগেডের কার্যক্রমও বেড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী এ সংগঠনের ৮ জন সন্দেহভাজন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে, যাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার।
২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে পাকিস্তানে মোট ২,৮৫৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে জঙ্গি, নিরাপত্তাকর্মী ও বেসামরিক নাগরিক। অক্টোবর মাসের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দেশটিতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান যেমন তীব্র হয়েছে, তেমনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডও অব্যাহত রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















