সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ অস্থিরতা নেপালের রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও নতুন আরোপিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পুলিশি গুলিতে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। এর পরপরই দেশজুড়ে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়, এবং তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের দিকে নিয়ে যায়। এখন সেই তরুণরাই নেপালের রাজনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করছে এবং দেশ পুনর্গঠনের দাবি তুলছে।
সিংহদরবারের ধ্বংসস্তূপ: সংকটের প্রতীক
অজয় ভদ্র খানালের দপ্তর থেকে দেখা যায় পুড়ে যাওয়া সিংহদরবারের ধ্বংসস্তূপ—১১৭ বছরের ঐতিহাসিক প্রাসাদ, যা গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিল নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সেদিন উন্মত্ত জনতা শুধু সিংহদরবারই নয়, বরং সংসদ ভবন, ফেডারেল অফিস ও অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেয়। কারাগার খুলে কয়েদিদের বের করে আনা হয়, রাজনীতিকদের বাড়িতে হামলা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা অলি পদত্যাগ করেন। পুলিশ বাহিনী হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে যায়—দেশ সম্পূর্ণ অরাজকতায় নিমজ্জিত হয়। এই চিত্র আজও নেপালের গভীর সংকটের স্মারক।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপান্তর
৮ সেপ্টেম্বর দুর্নীতিবিরোধী ও সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে ১৯ জনকে হত্যা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিহতদের বেশিরভাগই ছিল শিক্ষার্থী। দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, আন্দোলন আরও বৃহৎ হয় এবং বিশৃঙ্খলার সুযোগে দুষ্কৃতকারীরা প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। ১০ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দুই দিন পরে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সুসিলা কার্কিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি এবং তার প্রধান উপদেষ্টা অজয় ভদ্র খানাল এখন দেশের স্থিতিশীলতা এবং আগামী ৫ মার্চের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিশ্চিত করার দায়িত্বে আছেন।

কাঠমান্ডুর বর্তমান আবহ: আশা ও ভয়ের সহাবস্থান
নেপালের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার প্রায় তিন মাস পর কাঠমান্ডুতে স্থিতি ফিরলেও মানুষের মনে দুটি প্রবল অনুভূতি জায়গা করে নিয়েছে—আশা ও ভয়। অনেকে আশাবাদী যে নির্বাচন একটি নতুন জোটকে ক্ষমতায় আনতে পারে, যারা দুর্নীতি, বেকারত্ব ও দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা দূর করতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে ভয় রয়ে গেছে, নিরাপত্তা সংকট বা বড় দলগুলোর বয়কট নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করলে আবারও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। দেশে বর্তমানে যে শান্তি বিরাজ করছে তা খুবই নাজুক।
তিন প্রবীণ নেতার দীর্ঘদিনের আধিপত্য
নেপালের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বজায় রেখেছেন তিন প্রবীণ নেতা—শের বাহাদুর দেউবা (৭৯), পুষ্প কমল দাহাল প্রচণ্ড (৭১) এবং কে.পি. শর্মা অলি (৭৩)। ২০১৫ সালের সংবিধানের পর থেকে তারা ঘুরেফিরে জোট গড়ে ক্ষমতায় থেকেছেন। সাতবার সরকার পরিবর্তন হলেও নেতৃত্বের এই চক্র অপরিবর্তিত থেকেছে। জনরোষ তীব্র হলেও প্রবীণ নেতারা সেই ক্ষোভের গভীরতা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছেন না। অলি সংসদ পুনঃস্থাপনের দাবি তুলছেন, মাওবাদীরা সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে তা স্পষ্ট নয় এবং কংগ্রেস অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ব্যস্ত। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে সব দলই অবশেষে অংশগ্রহণে রাজি হয়।
তরুণদের উত্থান: নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব
সাম্প্রতিক সংকটে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে তরুণদের উত্থানে। যারা বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করছে বা রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ করছে। কিশোরী কার্কি—যিনি আহত এক বিক্ষোভকারীকে উদ্ধার করে দেশজুড়ে পরিচিত হন—সাক্ষাৎকারের সময়ই জানতে পারেন তার দল আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়েছে। প্রাদীপ গিয়াওয়ালি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিয়েছেন। অনেক তরুণকে প্রতিষ্ঠিত দলগুলো নিজেদের দলে নিতে উৎসাহী। সেপ্টেম্বরের আন্দোলনের পর প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার নতুন ভোটার ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছে—যা জনসাধারণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন সূচনা।

আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা
নেপালের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীন স্থিতিশীলতা এবং দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ভারত বড় দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে চাপ দিচ্ছে এবং নিরাপত্তা ও লজিস্টিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। চীনও সীমান্তে অস্থিরতা ঠেকাতে দ্রুত নির্বাচন চায়। পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো প্রকাশ্যে কিছু না বললেও পর্দার আড়ালে নির্বাচনের পক্ষেই রয়েছে। অন্যদিকে নেপালের রাজনীতিবিদদেরও আশঙ্কা—ক্ষমতা হারালে দুর্নীতির মামলার মুখে পড়তে পারেন তারা। তরুণ আন্দোলনকারীদের ভয়—বিক্ষোভকালে হামলার শিকার হওয়া পুলিশের একাংশ প্রতিশোধ নিতে পারে। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুসিলা কার্কি মনে করেন, মার্চের পর সরকার টিকে গেলে বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ফলে সবাই উদ্বিগ্ন অস্থিরতা আবার ফিরে আসতে পারে।
মূল সংকট: দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং তরুণদের হতাশা
দুর্নীতি নেপালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা হলেও এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর একটি উদ্বেগ—তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। নেপালের মধ্যম বয়স মাত্র ২৬, কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। প্রতি পাঁচ তরুণের একজন বেকার। মাথাপিছু আয় মাত্র ১,৪০০ ডলার—যা প্রতিবেশী ভারতের অর্ধেক। ফলে বিপুল সংখ্যক নেপালি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে—২.২ মিলিয়ন নেপালি বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বাস করে। তরুণ নেতা প্রাদীপ গিয়াওয়ালি বলেছেন, তার বহু বন্ধু বিদেশে রয়েছে এবং তাকে সেখানে যেতে পরামর্শ দিয়েছে, কিন্তু তিনি দেশে থেকে নিজের দক্ষতা ব্যবহার করে নেপালকে উন্নত করতে চান।
#NepalPolitics #YouthMovement #NepalElections2025 #SushilaKarki #KPSharmaOli #KathmanduUnrest #NepalYouthLeadership #CorruptionCrisis #SouthAsiaNews #SarakhanReport
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















