গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ইউরোপের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে হঠাৎ করেই অবস্থান বদলালেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে বক্তব্য এবং ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর আরোপের হুমকি দেওয়া শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে একটি ভবিষ্যৎ সমঝোতার কাঠামো তৈরির কথাও জানান তিনি। এই ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা যায়।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন বার্তা
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে একটি ভবিষ্যৎ চুক্তির কাঠামোতে পৌঁছেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল এমন নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে না। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি এমন একটি সমঝোতা, যাতে সবাই সন্তুষ্ট। এর আগে তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন না।

ন্যাটো সূত্র জানায়, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাতটি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে। এই আলোচনায় মূল লক্ষ্য হবে, যেন গ্রিনল্যান্ডে রাশিয়া বা চীন কোনোভাবেই অর্থনৈতিক বা সামরিক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
ডেনমার্ক ও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
ডেনমার্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানোর বদলে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত। দেশটির মতে, যেকোনো সিদ্ধান্তে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সম্মান ও অধিকার অক্ষুণ্ন থাকতে হবে।
জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল ট্রাম্পের ঘোষণার পরও সতর্ক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, সংলাপ শুরু হওয়া ইতিবাচক হলেও এখনই অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই।
নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ডিক স্কুফ বলেন, শুল্ক হুমকি প্রত্যাহার এবং উত্তেজনা প্রশমনের পথে এগোনো একটি ভালো সংকেত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপকে ন্যাটোর ভেতরে থেকেই আর্কটিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
শেয়ারবাজারে বড় উত্থান
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ওয়াল স্ট্রিটে শক্তিশালী র্যালি দেখা যায়। বিনিয়োগকারীরা নতুন শুল্ক যুদ্ধের আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন। ডাও জোন্স, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক—তিনটি সূচকই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড কার মালিকানায় যাবে, সেটি বাজারের জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং শুল্ক আরোপের ঝুঁকি কমে যাওয়াই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।
বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার মূলত অনিশ্চয়তা কমে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় চাঙা হয়েছে। আগ্রাসী বক্তব্য দিয়ে চাপ তৈরি করার পর আলোচনার পথে আসার কৌশল অতীতেও দেখা গেছে, আর বাজার সাধারণত এমন আলোচনাভিত্তিক ঝুঁকির সঙ্গে স্বচ্ছন্দ থাকে।

রাশিয়া ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়া
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান রাশিয়ার জন্য উদ্বেগের নয়। তিনি বিষয়টি উনিশ শতকে আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রির ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন এবং গ্রিনল্যান্ডের আনুমানিক মূল্য উল্লেখ করেন।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন পরে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন বলে জানানো হয়েছে, যদিও প্রাথমিকভাবে দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
দাভোসে ট্রাম্পের কঠোর ভাষণ
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সুর নরম হলেও দাভোসে দেওয়া দীর্ঘ ভাষণে ট্রাম্প ইউরোপের একাধিক দেশের বিরুদ্ধে কড়া ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি দাবি করেন, ওষুধের দাম বাড়াতে ফ্রান্সকে চাপ দিতে শুল্কের হুমকি দিয়েছিলেন। তবে ফ্রান্স এই বক্তব্যকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা জানিয়েছেন, শুল্ক হুমকি প্রত্যাহার করা হলেও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি পর্যালোচনায় নির্ধারিত জরুরি বৈঠক তারা চালিয়ে যাবেন।

গ্রিনল্যান্ড ঘিরে কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনার পর ট্রাম্পের হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি আপাতত ঠেকিয়েছে। শুল্ক যুদ্ধের আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় বাজারে স্বস্তি ফিরেছে, তবে ইউরোপীয় নেতারা এখনো সতর্ক। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ঘোষিত কাঠামো বাস্তবে কী রূপ নেয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















