উপকূলীয় ছোট্ট শহর নিউপোর্ট বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। শহরের প্রবেশপথে থাকা স্বাগত সাইনগুলোতে স্থানীয় অ্যাকোয়ারিয়াম, স্কুলের খেলাধুলার সাফল্য আর জাতীয় সমুদ্র–বায়ু প্রশাসনের (NOAA) প্যাসিফিক নৌবহরের উপস্থিতি—সবই গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। নিউপোর্ট যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭টি কোস্ট গার্ড শহরের একটি হিসেবেও পরিচিত।
কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে শহরটির এই সুসম্পর্ক হঠাৎ করেই নড়বড়ে হয়ে উঠেছে।
নিউজ এলার্ট: উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার সরিয়ে নেওয়া
প্রথম আঘাতটি আসে যখন হঠাৎ করেই কোস্ট গার্ড তাদের উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার নিউপোর্টের পৌর বিমানবন্দর থেকে সরিয়ে নিয়ে ৯৫ মাইল দক্ষিণে নর্থ বেন্ডে স্থানান্তর করে। শহরের নেতারা, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা বিপজ্জনক সাগরে কাজ করা বাণিজ্যিক মাছ ধরা পরিবার—কেউই আগে থেকে কিছু জানেননি।
উদ্ধার হেলিকপ্টারটি সবসময় ছিল তাদের নিরাপত্তার প্রধান ভরসা। কারণ প্রশান্ত মহাসাগরের এই অংশটিতে ঢেউ, জোয়ার, ঝড় এবং বার ক্রসিং এতটাই বিপজ্জনক যে প্রতিটি মিনিট জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
স্থানীয় জেলেরা প্রথমে গুজবটি অবিশ্বাস করলেও পরে জানতে পারেন—গুরুত্বপূর্ণ এই হেলিকপ্টারটি সত্যিই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিউপোর্ট থেকে গড় প্রতিক্রিয়া সময় ১৫–৩০ মিনিট, কিন্তু নর্থ বেন্ড থেকে সেটি কমপক্ষে আধঘন্টা বেশি লাগে।
স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে ১৯৮৫ সালের ট্রাজেডি—লাসেইন নামের একটি মাছধরা নৌকা উল্টে গেলে উদ্ধার হেলিকপ্টার দেরিতে পৌঁছানোয় তিনজন প্রাণ হারান। সেই ঘটনার পরই নিউপোর্টে স্থায়ী হেলিকপ্টার মোতায়েন হয়েছিল।

দ্বিতীয় ধাক্কা: বিমানবন্দরে আটক কেন্দ্রের প্রস্তুতির ইঙ্গিত
হেলিকপ্টার সরানোর পর দ্রুত নতুন তথ্য সামনে আসে। স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে ফোন যেতে শুরু করে—বড় আকারে পানি সরবরাহ, প্রতিদিন ১০ হাজার গ্যালন মানব বর্জ্য অপসারণ, বাস ড্রাইভার বা অভিবাসন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ—এসব চাহিদা যেন একটাই সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছিল: একটি বড় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) আটক কেন্দ্র বিমানবন্দরে স্থাপন করা হচ্ছে।
অরেগনের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ডেভিড গমবার্গ বলেন, “প্রমাণগুলো স্পষ্ট—যে জায়গায় কোস্ট গার্ডের কার্যক্রম ছিল, সেখানে কেউ একজন বড় আটক কেন্দ্রের পরিকল্পনা করছে।”
নিউইয়র্কের স্টেটেন আইল্যান্ড সহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকায় কোস্ট গার্ড স্থাপনাগুলো আইসিই ব্যবহারের জন্য পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদন রয়েছে। ফলে নিউপোর্টবাসী মনে করছেন—নিরাপত্তার চেয়ে অভিবাসন দমনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ।
স্থানীয়দের ক্ষোভ: সিদ্ধান্ত গোপন, আলোচনা হীন
নিউপোর্ট ফিশারমেন ওয়াইভস নামের সংগঠনের নেতা টাউনের ডিকসন বলেন,
“হেলিকপ্টার সরানোর সিদ্ধান্ত যেমন হতবাক করার মতো, তেমনি আশ্চর্যজনক হলো—আমাদের সাথে কোনও আলোচনা না করেই এটি করা হয়েছে।”
তিনি জানান, স্থানীয় কোস্ট গার্ড কমান্ডারও নিজে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছেন—এই বিষয়গুলো তাদের এখতিয়ারে নেই।
শহরের বাস্তবতা: ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্র, অভিবাসী শ্রমের বৃদ্ধি
নিউপোর্টে অর্থনীতি পুরোপুরি নির্ভরশীল মাছধরা ও পর্যটনের ওপর। এখানে প্রায় সবাই সমুদ্রপথে কাজ করা কাউকে না কাউকে চেনেন।
ইয়াকুইনা বে বার অতিক্রম করাই জেলেদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ঢেউ, জোয়ার, স্রোত আর পরিবর্তনশীল বালুচরের কারণে এটি যেন এক বিপজ্জনক বাধাবিপত্তির মাঠ।
নিউপোর্টের জলে পানি থাকে ১০–১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস; শীতল এই পানিতে পড়লে দ্রুত হাইপোথারমিয়া দেখা দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কাঁকড়া ধরার নৌবহরে মৃত্যুহার এমনকি আলাস্কার বেরিং সাগরের ফ্লিটের চেয়েও বেশি।
স্থানীয় বিশেষজ্ঞ অ্যামেলিয়া ভন জানান, “নিউপোর্টের কাছ থেকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলে জীবন-মৃত্যুর ফারাক গড়ে ওঠে।”
রাজনীতি, অভিবাসন ও ফেডারেল সরকারের প্রতি আস্থা
নিউপোর্টের জনসংখ্যা ছোট, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। কেউ ডেমোক্র্যাট, কেউ রিপাবলিকান হলেও শহরটি বরাবরই ফেডারেল সরকারের প্রতি আস্থাশীল।
স্থানীয় ক্রাবার গ্যারি রিপকা বলেন, “এই সম্প্রদায়ের ফেডারেল সরকারের ওপর আস্থা রয়েছে। আমাদের মধ্যে অযৌক্তিক সন্দেহ নেই।”
তিনি ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন এবং দক্ষিণ সীমান্তে কড়াকড়িকে সমর্থন করেন। তবে তার মতে, উদ্ধার হেলিকপ্টারের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

জনরোষ: হাজারো মানুষের প্রতিবাদ
১০ হাজার জনসংখ্যার শহরে সাম্প্রতিক সভা-সমাবেশে বিপুল ভিড় দেখা গেছে।
একটি টাউন হলে ৩০০ জন ক্ষুদ্র পতাকা হাতে উপস্থিত ছিলেন—যার ওপর লেখা ছিল, “নিউপোর্টে আইসিই নয়।” আরেকটি সভায় ৮০০ মানুষ ভিড় করেন।
অরিগনের সিনেটর রন ওয়াইডেন বলেন,
“ছোট শহরগুলোকে লক্ষ্য করা হলে তারা ভাবছে, এটা তাদের গোপন কৌশল। কিন্তু এই সম্প্রদায় তা মেনে নেবে না।”
আইনি লড়াই: হেলিকপ্টার ফেরত চেয়ে মামলা
লিংকন কাউন্টি, ওরিগন রাজ্য সরকার এবং ফিশারমেন ওয়াইভস—তিন পক্ষই হেলিকপ্টার অপসারণের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
ফেডারেল বিচারক ইতোমধ্যেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করে আগামী দুই সপ্তাহের জন্য হেলিকপ্টার ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে ফেডারেল সরকার জানিয়েছে—তারা এই মামলা জোরালোভাবে মোকাবিলা করবে, এবং স্থানীয় নেতাদের অভিযুক্ত করেছে কোস্ট গার্ডকে “অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে” রাখার চেষ্টা করার জন্য।
: নিউপোর্ট_সংকট অভিবাসন_নীতি কোস্টগার্ড_হেলিকপ্টার যুক্তরাষ্ট্র_রাজনীতি ট্রাম্প_প্রশাসন ওরিগন_সংবাদ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















