১১:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
ন্যাটোকে নতুন চ্যালেঞ্জে ফেলছে আর্কটিক: রাশিয়ার অগ্রযাত্রা ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির তাগিদ নিয়োগ বাণিজ্যে উপহারের বিনিময়ে সুবিধা: দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি কিমের আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ, জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এমন পরিস্থিতি ছিল প্রায় অসম্ভব জাপানের দিকে ধেয়ে আসছে দুই ঝড়, প্রবল বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত তাইওয়ান কর্মস্থলে মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে সিঙ্গাপুর, দুই সপ্তাহের নিরাপত্তা বিরতির আহ্বান জাপানে বইয়ের দোকান হারিয়ে যাচ্ছে, তবু শেষ লড়াইয়ে নতুন আশা ফিলিপাইনে স্কুলে গুলিবর্ষণের পর নতুন বিতর্ক, ফৌজদারি দায়ের বয়সসীমা কমানোর দাবি জোরালো সিউলের দিকে তাক করা নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ব্যবস্থা পরীক্ষা, সামরিক শক্তি প্রদর্শনে কিম জোহর নির্বাচনে তরুণ প্রার্থীদের বাজি, জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে পারে প্রভাব নিয়ন্ত্রণহীন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যমই গণতন্ত্রের ভিত্তি

চীনে বিরল পাখি রক্ষার লড়াই: ভোরের অন্ধকারে শিকারিদের পিছু ধাওয়া

ভোরের আলো ফোটার আগেই বেইজিং শহরের প্রান্তে নিঃশব্দ উত্তেজনা। চারদিকে ঘন ঘাসের মাঠ, দূরে ঘুমন্ত মহানগর। এমন এক পরিবেশে দিনের পর দিন এক মানুষ দাঁড়িয়ে পড়েন পাখি শিকারিদের সামনে। মানুষের তৈরি পৃথিবীতে পাখিদের বাঁচিয়ে রাখাই যার জীবনের ব্রত।

পাখি ধরার ফাঁদে আটকা জীবন
চীনের আকাশে প্রতিবছর কোটি কোটি পরিযায়ী পাখি দক্ষিণের উষ্ণ অঞ্চলের দিকে উড়ে যায়। সাইবেরিয়া ও মঙ্গোলিয়ার দীর্ঘ গ্রীষ্ম শেষে শীতের আগমনে তারা চীনের ওপর দিয়ে পাড়ি দেয়। এই যাত্রাপথেই লুকিয়ে থাকে বিপদ। শহরের বাইরে থাকা ঘাসভূমি যেমন পাখিদের বিশ্রামের আশ্রয়, তেমনি শিকারিদের জন্য সহজ ফাঁদ পাতার জায়গা। অদৃশ্য জালের ফাঁদে আটকে পড়ে অসংখ্য ছোট পাখি, যাদের অনেকেই চীনে সংরক্ষিত প্রজাতি।

অর্থনৈতিক চাপ ও কালোবাজার
মহামারির পর অর্থনৈতিক মন্দা এবং আবাসন সংকটে অনেকেই দ্রুত আয়ের পথ খুঁজছেন। সেই সুযোগে বিরল গানের পাখি ধরা ও বিক্রি কম ঝুঁকির লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। একটি সুন্দর গানের পাখি বিক্রি হয় হাজার হাজার ইউয়ানে, যা অনেক কৃষকের মাসিক আয়ের চেয়েও বেশি। ফলে কালোবাজারে এই ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।

এক মানুষের প্রতিরোধ
এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছেন সিলভা গু। নিজের সঞ্চয় খরচ করে, বিনা পারিশ্রমিকে তিনি বছরের পর বছর শিকারিদের ধরিয়ে দিচ্ছেন। ভোরের অন্ধকারে ফাঁদ খুঁজে বের করা, পুলিশ ডাকা, পাখিদের মুক্ত করা—সবই তার দৈনন্দিন কাজ। একসময় পুলিশ এই অপরাধকে গুরুত্ব না দিলেও, ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। শিকারি ধরতে গিয়ে অন্য অপরাধের সূত্রও মিলছে, ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আগ্রহ বেড়েছে।

শহরায়ণ ও হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি
নব্বইয়ের দশকের বেইজিং ছিল ভিন্ন। শহরের প্রান্তে বিস্তৃত ঘাসভূমি ছিল পাখি ও বন্যপ্রাণীর আশ্রয়। দ্রুত শহরায়ণের ফলে সেই ভূমি সংকুচিত হয়েছে। সিলভার চোখের সামনে হারিয়ে গেছে শৈশবের প্রকৃতি। সেই ধাক্কাই তাকে সংরক্ষণ আন্দোলনে নামতে বাধ্য করে।

হুমকি ও একাকিত্ব
এই পথে চলা সহজ নয়। একসময় বড় এক পাখি ব্যবসায়ীর হামলার শিকার হয়েছেন তিনি। স্বেচ্ছাসেবকের দল ভেঙে গেছে ঝুঁকি ও কষ্টের ভয়ে। তবুও তিনি থামেননি। প্রযুক্তির সহায়তায় স্যাটেলাইট ছবি দেখে শিকারিদের চলার পথ ও ফাঁদের অবস্থান চিহ্নিত করছেন। এতে এক রাতে শত শত পাখি বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে।

পুরোনো অভ্যাস ও নতুন সচেতনতা
চীনে পোষা পাখি রাখা একসময় সামাজিক মর্যাদার প্রতীক ছিল। বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে এই অভ্যাস এখনো রয়ে গেছে। অনেকেই বুঝতে পারেন না, এটি আইনবিরুদ্ধ এবং প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ও গণমাধ্যমে পাখি সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। পুলিশের অভিযান বাড়ছে, বাজারে ধরপাকড় চলছে।

আশার সুর
দশ বছরে সিলভা গু উদ্ধার করেছেন হাজার হাজার পাখি। তার বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির মূল্য বুঝবে। যতদিন সেই পরিবর্তন পুরোপুরি না আসে, ততদিন তিনি মাঠে থাকবেন। তার ইচ্ছা, বেইজিংয়ের আকাশ আবার ভরে উঠুক শৈশবের মতো পাখির গানে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ন্যাটোকে নতুন চ্যালেঞ্জে ফেলছে আর্কটিক: রাশিয়ার অগ্রযাত্রা ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির তাগিদ

চীনে বিরল পাখি রক্ষার লড়াই: ভোরের অন্ধকারে শিকারিদের পিছু ধাওয়া

০১:২৫:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

ভোরের আলো ফোটার আগেই বেইজিং শহরের প্রান্তে নিঃশব্দ উত্তেজনা। চারদিকে ঘন ঘাসের মাঠ, দূরে ঘুমন্ত মহানগর। এমন এক পরিবেশে দিনের পর দিন এক মানুষ দাঁড়িয়ে পড়েন পাখি শিকারিদের সামনে। মানুষের তৈরি পৃথিবীতে পাখিদের বাঁচিয়ে রাখাই যার জীবনের ব্রত।

পাখি ধরার ফাঁদে আটকা জীবন
চীনের আকাশে প্রতিবছর কোটি কোটি পরিযায়ী পাখি দক্ষিণের উষ্ণ অঞ্চলের দিকে উড়ে যায়। সাইবেরিয়া ও মঙ্গোলিয়ার দীর্ঘ গ্রীষ্ম শেষে শীতের আগমনে তারা চীনের ওপর দিয়ে পাড়ি দেয়। এই যাত্রাপথেই লুকিয়ে থাকে বিপদ। শহরের বাইরে থাকা ঘাসভূমি যেমন পাখিদের বিশ্রামের আশ্রয়, তেমনি শিকারিদের জন্য সহজ ফাঁদ পাতার জায়গা। অদৃশ্য জালের ফাঁদে আটকে পড়ে অসংখ্য ছোট পাখি, যাদের অনেকেই চীনে সংরক্ষিত প্রজাতি।

অর্থনৈতিক চাপ ও কালোবাজার
মহামারির পর অর্থনৈতিক মন্দা এবং আবাসন সংকটে অনেকেই দ্রুত আয়ের পথ খুঁজছেন। সেই সুযোগে বিরল গানের পাখি ধরা ও বিক্রি কম ঝুঁকির লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। একটি সুন্দর গানের পাখি বিক্রি হয় হাজার হাজার ইউয়ানে, যা অনেক কৃষকের মাসিক আয়ের চেয়েও বেশি। ফলে কালোবাজারে এই ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।

এক মানুষের প্রতিরোধ
এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছেন সিলভা গু। নিজের সঞ্চয় খরচ করে, বিনা পারিশ্রমিকে তিনি বছরের পর বছর শিকারিদের ধরিয়ে দিচ্ছেন। ভোরের অন্ধকারে ফাঁদ খুঁজে বের করা, পুলিশ ডাকা, পাখিদের মুক্ত করা—সবই তার দৈনন্দিন কাজ। একসময় পুলিশ এই অপরাধকে গুরুত্ব না দিলেও, ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। শিকারি ধরতে গিয়ে অন্য অপরাধের সূত্রও মিলছে, ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আগ্রহ বেড়েছে।

শহরায়ণ ও হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি
নব্বইয়ের দশকের বেইজিং ছিল ভিন্ন। শহরের প্রান্তে বিস্তৃত ঘাসভূমি ছিল পাখি ও বন্যপ্রাণীর আশ্রয়। দ্রুত শহরায়ণের ফলে সেই ভূমি সংকুচিত হয়েছে। সিলভার চোখের সামনে হারিয়ে গেছে শৈশবের প্রকৃতি। সেই ধাক্কাই তাকে সংরক্ষণ আন্দোলনে নামতে বাধ্য করে।

হুমকি ও একাকিত্ব
এই পথে চলা সহজ নয়। একসময় বড় এক পাখি ব্যবসায়ীর হামলার শিকার হয়েছেন তিনি। স্বেচ্ছাসেবকের দল ভেঙে গেছে ঝুঁকি ও কষ্টের ভয়ে। তবুও তিনি থামেননি। প্রযুক্তির সহায়তায় স্যাটেলাইট ছবি দেখে শিকারিদের চলার পথ ও ফাঁদের অবস্থান চিহ্নিত করছেন। এতে এক রাতে শত শত পাখি বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে।

পুরোনো অভ্যাস ও নতুন সচেতনতা
চীনে পোষা পাখি রাখা একসময় সামাজিক মর্যাদার প্রতীক ছিল। বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে এই অভ্যাস এখনো রয়ে গেছে। অনেকেই বুঝতে পারেন না, এটি আইনবিরুদ্ধ এবং প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ও গণমাধ্যমে পাখি সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। পুলিশের অভিযান বাড়ছে, বাজারে ধরপাকড় চলছে।

আশার সুর
দশ বছরে সিলভা গু উদ্ধার করেছেন হাজার হাজার পাখি। তার বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির মূল্য বুঝবে। যতদিন সেই পরিবর্তন পুরোপুরি না আসে, ততদিন তিনি মাঠে থাকবেন। তার ইচ্ছা, বেইজিংয়ের আকাশ আবার ভরে উঠুক শৈশবের মতো পাখির গানে।