বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল দায়িত্বে থাকা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ২০২৫ সাল শেষ করেছে তীব্র সমালোচনার মুখে। বারবার আশ্বাস, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সত্ত্বেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নে গতি আনতে ব্যর্থ হয়েছে মন্ত্রণালয়। সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষায়, এডিপির বাস্তবায়ন হার নেমেছে এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে, যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৫৫ শতাংশের নিচে ছিল। সাধারণত এই সময়ে বাস্তবায়ন হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলে। অথচ ২০২৫ সালে সেই স্বাভাবিক গতি দেখা যায়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে পৌঁছেও ৫০ শতাংশের নিচে বাস্তবায়ন ধরে রেখেছে।
ধীরগতির পেছনের কারণ
সাধারণত অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রকল্প ব্যয় বাড়ে, কিন্তু ২০২৫ সালে সেই চিত্র উল্টো ছিল। মাসভিত্তিক ব্যয় ছিল মন্থর এবং বছরের শেষে ব্যয়ের স্বাভাবিক জোয়ার আসেনি। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থের অভাব নয়, বরং পরিকল্পনার দুর্বলতা, ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রস্তুতির ঘাটতি এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ব্যর্থতাই এই ধীরগতির মূল কারণ।

নির্দেশনা থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব
বছরজুড়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় একাধিক এডিপি পর্যালোচনা সভা করেছে, ধীরগতির প্রকল্প পরিচালকদের সতর্ক করেছে এবং বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে এসব নির্দেশনার বাস্তব ফল খুব একটা দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা অদক্ষ প্রকল্প পরিচালনা পরিবর্তনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় একই প্রকল্প বারবার ধীরগতির তালিকায় রয়ে গেছে।
মেগা প্রকল্পেও জট
বড় ও আলোচিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলিও বিলম্ব থেকে রেহাই পায়নি। জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, নকশা পরিবর্তন, ঠিকাদারের অদক্ষতা এবং বিদেশি ঋণ ছাড়ে দেরি মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি থামিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালে অনেক প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং ব্যয়ও বেড়েছে, যা সমালোচকদের মতে এখন ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মে পরিণত হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ঝুঁকি

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, বারবার প্রকল্প সংশোধন আর ব্যয় বাড়ানো রাজস্ব শৃঙ্খলা দুর্বল করে এবং সরকারি বিনিয়োগের দক্ষতা নিয়ে আস্থা কমায়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক অর্থায়নের চাপের মধ্যে কার্যকর সরকারি বিনিয়োগ অর্থনীতিকে চাঙা করার কথা ছিল। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পে কম ব্যয়ের কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সেবার উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে।
বাস্তবতা ও পরিকল্পনার ফারাক
প্রতি বছরই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বড় আকারের এডিপি অনুমোদন দিচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই বরাদ্দের বড় অংশই বাস্তবে খরচ হয় না। বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়াই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।
জবাবদিহির সংকট
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে জবাবদিহির অভাব। অনেক প্রকল্প পরিচালক একসঙ্গে একাধিক প্রকল্প সামলান এবং বিলম্ব বা ব্যয় বাড়লেও তেমন কোনো শাস্তির মুখে পড়েন না। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পেশাদার করার আলোচনা থাকলেও ২০২৫ সালেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান সংস্কার হয়নি।

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
উন্নয়ন বিলম্বের প্রভাব শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব জীবনেও পড়ছে। অসম্পূর্ণ সড়ক, দেরিতে চালু হওয়া হাসপাতাল, অর্ধসমাপ্ত স্কুল ও পানির প্রকল্প সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে শহরের বাইরে এই হতাশা আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালের শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সামনে স্পষ্ট চিত্র দাঁড়িয়েছে। বাস্তবায়নে রেকর্ড ধীরগতি, সংস্কারের স্থবিরতা এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে বাড়তে থাকা ব্যবধান। বাস্তবসম্মত এডিপি আকার নির্ধারণ, কঠোর প্রকল্প যাচাই, কার্যকর জবাবদিহি ও পেশাদার প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। ২০২৫ সাল তাই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে উন্নয়নের স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তবায়নের ব্যর্থতার বছর হিসেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















