বাংলাদেশের কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে দীর্ঘ আট বছর অপেক্ষার পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে ঘরে ফেরার স্বপ্ন জেগেছে। অস্থায়ী জীবন, সংকুচিত ঘর আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভেতর তারা নিজেরাই বেছে নিয়েছে একটি নেতৃত্ব পরিষদ, যার মাধ্যমে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হবে—এই আশাই এখন শিবিরজুড়ে।
শিবির জীবনের ক্লান্তি আর ফেরার আকুতি
কক্সবাজারে প্রায় আট হাজার একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত শিবিরে বসবাস করছে প্রায় সতেরো লাখ রোহিঙ্গা। দুই হাজার সতেরো সালের সহিংস অভিযানের সময় তারা রাখাইন থেকে পালিয়ে আসে। সেই সহিংসতা এখন আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার অভিযোগে তদন্তাধীন। শিবিরের ভেতর ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকা মানুষগুলো জানায়, গরমে শ্বাস নেওয়াই কঠিন। একসময় মিয়ানমারের গ্রামে বড় গাছের ছায়ায় বসে যে স্বস্তি মিলত, তার স্মৃতি আজ চোখে জল আনে।

প্রথমবারের মতো ভোট আর নেতৃত্ব পরিষদ
গত জুলাইয়ে শরণার্থীরা তাদের প্রথম নির্বাচন আয়োজন করে। তেত্রিশটি শিবির থেকে তিন হাজারের বেশি ভোটার অংশ নেন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় রোহিঙ্গা ঐক্য পরিষদ। পরিষদের নির্বাহী কমিটি ও ঘূর্ণায়মান পাঁচজন সভাপতি মানবাধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করবেন বলে জানানো হয়েছে। শিবিরের এক সমাবেশে পরিষদের সভাপতি বলেন, রাখাইন থেকে পালানোর পথে নিহত মা-বোনদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে ঘরে ফেরার জন্য—এই আহ্বানে সমবেত মানুষ মাথা নেড়ে সায় দেয়।
আলোচনার টেবিলে কণ্ঠস্বর হওয়ার চেষ্টা
নতুন পরিষদের লক্ষ্য আলোচনার টেবিলে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা। দীর্ঘদিন ধরে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত হলেও তারা ছিলেন না অংশীজন। এখন সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা চলছে। তরুণ প্রজন্ম বলছে, শিক্ষা বাড়লে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় করা সহজ হবে এবং প্রত্যাবর্তনের দাবি আরও জোরালো হবে।

পুরোনো ভয় আর নতুন বিশ্বাস
এর আগেও রোহিঙ্গাদের সংগঠিত করার উদ্যোগ ছিল। তবে দুই হাজার একুশ সালে এক শীর্ষ নেতার হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী দমন-পীড়নে অনেক সংগঠন ভেঙে পড়ে। দুই হাজার উনিশ সালের এক সমাবেশের পর বহু আয়োজক আটক হন। তবু ধীরে ধীরে শিবিরে আস্থা ফিরছে। এখন অনেকে অভিযোগ নিয়ে নতুন পরিষদের কার্যালয়ে আসছেন, যা নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাসের ইঙ্গিত।
নিরাপত্তা ও সমালোচনার চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পরিষদ কতটা স্বাধীনভাবে পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। শিবিরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং সহিংসতার আশঙ্কা রাজনৈতিক সংলাপ কে দুর্বল করে রাখছে। অধিকারকর্মী বলছেন, শিবিরের ভেতর সহিংসতা বন্ধ না হলে প্রত্যাবর্তনের পথ আরও কঠিন হবে।

আশার শেষ আলো
সব সংশয় সত্ত্বেও শিবিরের ভেতর একটি কথাই বারবার শোনা যাচ্ছে—তারা ফিরতে চায়। নতুন নেতৃত্ব সেই আকাঙ্ক্ষাকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। ঘরে ফেরার পথ কতটা দীর্ঘ হবে, তা অনিশ্চিত। তবে দীর্ঘ অন্ধকারে এটুকু আলোই এখন তাদের ভরসা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















