০৮:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬
লেনদেন কমলেও সূচকে সবুজ, সপ্তাহ শেষে উর্ধ্বমুখী দেশের পুঁজিবাজার ভিসা জামানতে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রমুখী ব্যবসা যাত্রায় নতুন শঙ্কা শহরের হৃদয়ে বিদ্যুৎচালিত বিপ্লব: পেট্রোল মুক্ত হতে যাচ্ছে হো চি মিন মিনেসোটায় আইসির গুলিতে মার্কিন নাগরিক নিহত, তীব্র উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র শেরপুরে পাহাড়ে লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে বুনো হাতির আক্রমণে শ্রমিক নিহত এক টুকরো হাসি নিয়ে গিয়েছিল রোহান, ফিরল শুধু নিস্তব্ধতা সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্প হারলে ১৫০ বিলিয়ন ডলার ফেরত নিয়ে বড় লড়াইয়ের শঙ্কা আমি নিজেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি উত্তরের জেলাগুলোতে শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন ও জীবিকা জার্মান রাষ্ট্রপতির কঠোর অভিযোগ মার্কিন নীতি বিশ্বব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে

নাইজেরিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মুসলিম সমাজে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়াল

নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সোকোটো রাজ্যে গত মাসে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়, বিভ্রান্তি ও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বড়দিনের রাতে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে ফসলের মাঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা কোনো মৃত্যুর প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখেননি বা শোনেননি। তবু আকাশে আগুনের গোলা ছুটে যাওয়ার দৃশ্য বহু মানুষের মনে স্থায়ী আতঙ্ক রেখে গেছে।

মাঠে গর্ত, মনে প্রশ্ন

সোকোটোর জাবো গ্রামের ভুট্টা খেতে অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটি গর্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে তিনজন পশুপালক নীরবে তাকিয়ে ছিলেন। কেন এই এলাকায় হামলা হলো, তা নিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলার পর কৌতূহল থেকেই তারা বহু দূর পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। তাঁদের ভাষ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ প্রথমে মাটিতে আছড়ে পড়ে কিছুটা দূরে লাফিয়ে বিস্ফোরিত হয়। আশেপাশে থাকা খড়ের স্তূপে আগুন ধরে গোলাকার পোড়া দাগ পড়ে, আর একটি বড় ধাতব নল অক্ষত অবস্থায় মাঠে পড়ে থাকে।

নিরাপদ গ্রামেই বিস্ফোরণ

সোকোটো রাজ্যের নানা এলাকায় সহিংসতা থাকলেও জাবো ছিল তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পাশের অঞ্চলগুলোতে গবাদিপশু লুট, অপহরণ ও সশস্ত্র হামলার খবর মিললেও এই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল বহু পরিবার। তাই এখানে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ার খবরে বিস্ময় আরও বেড়েছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার ধ্বংসাবশেষ দুর্ঘটনাবশত জাবোতে পড়েছে। কিন্তু ধীরগতির তথ্যপ্রবাহে সেই বার্তা সবার কাছে পৌঁছায়নি।

মৃত্যুর প্রমাণ নেই, ভয় রয়ে গেছে

হামলার পর গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো মাঠঘাট ঘুরে ক্ষয়ক্ষতি দেখেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, যদি লক্ষ্যবস্তু সত্যিই ধ্বংস হয়ে থাকে, তবে তার কোনো চিহ্ন নেই। অন্যদের কথায়, তারা কোনো লাশ বা আহতের খবর পাননি। তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, যদি সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করা হয়ে থাকে, তবে কেন ফসলের জমি ও খালি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

সন্দেহের রাজনীতি

মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বলা হয়েছে, খ্রিস্টান হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত উগ্র গোষ্ঠী ছিল লক্ষ্যবস্তু। নাইজেরিয়ার তথ্য মন্ত্রণালয় দুটি বড় সন্ত্রাসী ঘাঁটি আক্রান্ত হওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু স্থানীয়দের বর্ণনায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে চাষের জমিতে, কিছু খালি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর একটি পরিত্যক্ত শিবিরে বিস্ফোরণ ঘটেছে যেখান থেকে হামলার আগেই লোকজন সরে গিয়েছিল।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সোকোটোতে একটি উদ্বেগজনক ধারণা ছড়াচ্ছে। অনেকের মনে হচ্ছে, মুসলিম এলাকাকেই নিশানা করা হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, এত আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন চাষাবাদ করা গ্রামে বোমা পড়ল।

ইতিহাস ও আতঙ্ক

এ অঞ্চলের ইতিহাস ও সন্দেহ বাড়াচ্ছে। সোকোটো খিলাফত একসময় ছিল আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য গুলোর একটি। শহর আজও সুলতানের প্রাসাদ ও ঐতিহাসিক সমাধিস্থলের জন্য পরিচিত। এমন পটভূমিতে বাইরের শক্তির হামলা স্থানীয় মুসলিম সমাজকে আরও অস্থির করে তুলেছে।

সহিংসতার জটিল বাস্তবতা

সোকোটোর প্রান্তিক এলাকায় বসবাসকারী মুসলিম কৃষক ও পশুপালকেরা বলছেন, সহিংসতা এখানে খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয়ের জীবনকেই বিপন্ন করেছে। এক বছর আগে লাকুরাওয়া নামের একটি গোষ্ঠী এলাকায় এসে শৃঙ্খলা আনার নামে কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেয়। তারা ধূমপান ও গান নিষিদ্ধ করে, দাড়ি কাটার জন্য নাপিতদের মারধর করে। কৃষক ও পশুপালকদের বিরোধ মীমাংসার প্রস্তাব দিলেও ক্ষতিপূরণের টাকা নিজেদের কাছে রেখে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এখন অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সেই গোষ্ঠী ফিরে এলে সহিংসতা আরও ভয়াবহ হবে। তাই কেউ কেউ গবাদিপশু সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ মনে হওয়া এলাকায়, যদিও সেখানে চারণভূমি কম।

সামনে অনিশ্চিত দিন

মার্কিন ও নাইজেরিয়ান কর্মকর্তারা গোয়েন্দা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন। তবে গ্রামবাসীদের মনে প্রশ্নের শেষ নেই। তাঁদের একটাই প্রার্থনা, এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে। মাঠে পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের চেয়েও ভারী হয়ে আছে মানুষের মনে জমে থাকা ভয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

লেনদেন কমলেও সূচকে সবুজ, সপ্তাহ শেষে উর্ধ্বমুখী দেশের পুঁজিবাজার

নাইজেরিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মুসলিম সমাজে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়াল

০৫:০৩:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সোকোটো রাজ্যে গত মাসে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়, বিভ্রান্তি ও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বড়দিনের রাতে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে ফসলের মাঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা কোনো মৃত্যুর প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখেননি বা শোনেননি। তবু আকাশে আগুনের গোলা ছুটে যাওয়ার দৃশ্য বহু মানুষের মনে স্থায়ী আতঙ্ক রেখে গেছে।

মাঠে গর্ত, মনে প্রশ্ন

সোকোটোর জাবো গ্রামের ভুট্টা খেতে অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটি গর্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে তিনজন পশুপালক নীরবে তাকিয়ে ছিলেন। কেন এই এলাকায় হামলা হলো, তা নিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলার পর কৌতূহল থেকেই তারা বহু দূর পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। তাঁদের ভাষ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ প্রথমে মাটিতে আছড়ে পড়ে কিছুটা দূরে লাফিয়ে বিস্ফোরিত হয়। আশেপাশে থাকা খড়ের স্তূপে আগুন ধরে গোলাকার পোড়া দাগ পড়ে, আর একটি বড় ধাতব নল অক্ষত অবস্থায় মাঠে পড়ে থাকে।

নিরাপদ গ্রামেই বিস্ফোরণ

সোকোটো রাজ্যের নানা এলাকায় সহিংসতা থাকলেও জাবো ছিল তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পাশের অঞ্চলগুলোতে গবাদিপশু লুট, অপহরণ ও সশস্ত্র হামলার খবর মিললেও এই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল বহু পরিবার। তাই এখানে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ার খবরে বিস্ময় আরও বেড়েছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার ধ্বংসাবশেষ দুর্ঘটনাবশত জাবোতে পড়েছে। কিন্তু ধীরগতির তথ্যপ্রবাহে সেই বার্তা সবার কাছে পৌঁছায়নি।

মৃত্যুর প্রমাণ নেই, ভয় রয়ে গেছে

হামলার পর গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো মাঠঘাট ঘুরে ক্ষয়ক্ষতি দেখেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, যদি লক্ষ্যবস্তু সত্যিই ধ্বংস হয়ে থাকে, তবে তার কোনো চিহ্ন নেই। অন্যদের কথায়, তারা কোনো লাশ বা আহতের খবর পাননি। তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, যদি সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করা হয়ে থাকে, তবে কেন ফসলের জমি ও খালি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

সন্দেহের রাজনীতি

মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বলা হয়েছে, খ্রিস্টান হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত উগ্র গোষ্ঠী ছিল লক্ষ্যবস্তু। নাইজেরিয়ার তথ্য মন্ত্রণালয় দুটি বড় সন্ত্রাসী ঘাঁটি আক্রান্ত হওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু স্থানীয়দের বর্ণনায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে চাষের জমিতে, কিছু খালি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর একটি পরিত্যক্ত শিবিরে বিস্ফোরণ ঘটেছে যেখান থেকে হামলার আগেই লোকজন সরে গিয়েছিল।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সোকোটোতে একটি উদ্বেগজনক ধারণা ছড়াচ্ছে। অনেকের মনে হচ্ছে, মুসলিম এলাকাকেই নিশানা করা হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, এত আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন চাষাবাদ করা গ্রামে বোমা পড়ল।

ইতিহাস ও আতঙ্ক

এ অঞ্চলের ইতিহাস ও সন্দেহ বাড়াচ্ছে। সোকোটো খিলাফত একসময় ছিল আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য গুলোর একটি। শহর আজও সুলতানের প্রাসাদ ও ঐতিহাসিক সমাধিস্থলের জন্য পরিচিত। এমন পটভূমিতে বাইরের শক্তির হামলা স্থানীয় মুসলিম সমাজকে আরও অস্থির করে তুলেছে।

সহিংসতার জটিল বাস্তবতা

সোকোটোর প্রান্তিক এলাকায় বসবাসকারী মুসলিম কৃষক ও পশুপালকেরা বলছেন, সহিংসতা এখানে খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয়ের জীবনকেই বিপন্ন করেছে। এক বছর আগে লাকুরাওয়া নামের একটি গোষ্ঠী এলাকায় এসে শৃঙ্খলা আনার নামে কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেয়। তারা ধূমপান ও গান নিষিদ্ধ করে, দাড়ি কাটার জন্য নাপিতদের মারধর করে। কৃষক ও পশুপালকদের বিরোধ মীমাংসার প্রস্তাব দিলেও ক্ষতিপূরণের টাকা নিজেদের কাছে রেখে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এখন অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সেই গোষ্ঠী ফিরে এলে সহিংসতা আরও ভয়াবহ হবে। তাই কেউ কেউ গবাদিপশু সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ মনে হওয়া এলাকায়, যদিও সেখানে চারণভূমি কম।

সামনে অনিশ্চিত দিন

মার্কিন ও নাইজেরিয়ান কর্মকর্তারা গোয়েন্দা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন। তবে গ্রামবাসীদের মনে প্রশ্নের শেষ নেই। তাঁদের একটাই প্রার্থনা, এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে। মাঠে পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের চেয়েও ভারী হয়ে আছে মানুষের মনে জমে থাকা ভয়।