বিশ্ব গাড়ি শিল্প যখন দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছে, তখন টয়োটা ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিস্তার তীব্র হলেও জাপানের এই নির্মাতা মনে করছে, ভিন্ন বাজারে ভিন্ন প্রযুক্তির চাহিদা রয়েছে। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে টয়োটা ভবিষ্যতেও ইঞ্জিন প্রযুক্তি ধরে রাখার কৌশল নিয়েছে।
টয়োটার চেয়ারম্যান আকিও টয়োটা মনে করেন, শিল্পপণ্য হিসেবে গাড়ি ধীরে ধীরে একঘেয়ে হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছে। তার দৃষ্টিতে, কেবল ব্যাটারি ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা গাড়ি নির্মাতাদের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করতে পারে। তাই টয়োটার আত্মপরিচয়ের অংশ হিসেবে ইঞ্জিনের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি বারবার তুলে ধরছেন।
বিলাসবহুল স্পোর্টস গাড়িতে বড় ইঞ্জিনের প্রত্যাবর্তন
ডিসেম্বরের শুরুতে টয়োটা ভবিষ্যতের জন্য তিনটি অতি বিলাসবহুল স্পোর্টস গাড়ির ধারণা উন্মোচন করে। এর মধ্যে হাইব্রিড গ্র জিটি মডেলটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। প্রায় দুই হাজার সাতাশ সালে বাজারে আসার কথা থাকা এই গাড়িতে রয়েছে চার লিটার ভি এইট ইঞ্জিন, যা টয়োটার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ব্যবহৃত হবে।

বর্তমান প্রিয়াস হাইব্রিড যেখানে তুলনামূলক ছোট ইঞ্জিন ব্যবহার করে, সেখানে পরিবেশগত নিয়ম আরও কঠোর হওয়ার সময় বড় ইঞ্জিনের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। তবে টয়োটার যুক্তি হলো, উন্নত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সঙ্গে ইঞ্জিনকে সমন্বয় করলে নিয়ম মানা সম্ভব এবং একই সঙ্গে পারফরম্যান্সের ঐতিহ্য বজায় রাখা যায়। গ্র জিটি পুরোপুরি টয়োটার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি, যা তাদের আত্মনির্ভরতার বার্তাও বহন করে।
ইঞ্জিন রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
দুই হাজার পঁচিশ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইঞ্জিন সরবরাহকারীদের এক সমাবেশে টয়োটার কর্মকর্তারা ঘোষণা দেন, দুই হাজার ত্রিশ সাল পর্যন্ত নতুন প্রজন্মের উচ্চক্ষমতার ইঞ্জিন উন্নয়ন চলবে। লক্ষ্য একদিকে আধুনিকায়ন, অন্যদিকে মোট ইঞ্জিন উৎপাদনের সংখ্যা ধরে রাখা।
এই অবস্থান আসলে বৈশ্বিক বাজারের বিভাজনের প্রতিফলন। চীনে যেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ির দাপট বাড়ছে, সেখানে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে সেই গতি শ্লথ হয়েছে বা কোথাও উল্টো পথে যাচ্ছে। টয়োটা এই দুই বাস্তবতার মাঝামাঝি ভারসাম্য খুঁজছে।
আমেরিকার বাজারে হাইব্রিডের জোর
যুক্তরাষ্ট্রে টয়োটার নজর স্পষ্টভাবে হাইব্রিডের দিকে। উত্তর ক্যারোলিনায় ব্যাটারি কারখানা চালু করার দিনই প্রতিষ্ঠানটি জানায়, আগামী পাঁচ বছরে দেশটিতে প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এর লক্ষ্য হাইব্রিড ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং জাপান থেকে আমদানি কমানো।
চাহিদাই এই সিদ্ধান্তের মূল চালিকা শক্তি। দুই হাজার পঁচিশ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন গাড়ি বিক্রির মধ্যে হাইব্রিডের অংশ ছিল উল্লেখযোগ্য। টয়োটার রাভ ফোর মডেলটি এখন উত্তর আমেরিকায় তৈরি হচ্ছে, যা এই কৌশলের বাস্তব উদাহরণ।
চীনে ভিন্ন বাস্তবতা, ভিন্ন পথ
চীনে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে স্থানীয় নির্মাতাদের দাম কমানোর প্রতিযোগিতায় টয়োটা চাপের মুখে। পরপর তিন বছর বিক্রি কমেছে। এই প্রেক্ষাপটে টয়োটা ঘোষণা করেছে, চীনের জন্য আলাদা করে গাড়ি তৈরি করা হবে, যা বৈশ্বিক বাজারের জন্য নয়, বরং স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে মানানসই।
স্থানীয় অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি বৈদ্যুতিক মডেল তুলনামূলক সস্তা ব্যাটারি ব্যবহার করে বাজারে এসেছে এবং দ্রুত বিক্রিও পেয়েছে। সামনে আরও নতুন বৈদ্যুতিক মডেল আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ব্যয় ও অংশীদারিত্বের ভারসাম্য
একাধিক শক্তির উৎসে গাড়ি তৈরি করা ব্যয়বহুল। গবেষণা ও উন্নয়নে টয়োটার বিনিয়োগ বিপুল হলেও প্রতিদ্বন্দ্বীরাও পিছিয়ে নেই। তাই টয়োটা এখন অংশীদারিত্বের পথেও হাঁটছে। সংঘর্ষ প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও সংযুক্ত গাড়ির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে, পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় চালনার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে।
টয়োটার বিশ্বাস, বৈচিত্র্যময় প্রযুক্তির সমন্বয়ই তাদের ভবিষ্যৎ। বৈদ্যুতিক গাড়ির যুগে ঢুকেও ইঞ্জিনকে ছেড়ে না দিয়ে তারা নিজেদের পরিচয় ও বাজার দুটোই রক্ষা করতে চায়।
Sarakhon Report 



















