নতুন মৌসুমের শুরুতে বিশ্ব ব্যাডমিন্টন টুর ফাইনালসের নিষ্প্রভ পর্ব পেরিয়ে ভারতীয় ব্যাডমিন্টন দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। পতনের গভীরে নয়, আবার সোনালি সাফল্যের চূড়াতেও নয়। দুই হাজার পঁচিশ সাল ভারতকে নিয়মিত শিরোপা বা ধারাবাহিক আধিপত্য দেয়নি। তবু বিশ্ব ব্যাডমিন্টনের আলোচনায় ভারত পুরোপুরি হারিয়েও যায়নি। এই সীমিত উপস্থিতির প্রধান ভরসা ছিলেন মাত্র এক জুটি—সাত্বিকসাইরাজ রাঙ্কিরেড্ডি ও চিরাগ শেট্টি।
শিরোপাহীন হলেও শেষ চারে
পুরুষ দ্বৈতের এই জুটি বছরজুড়ে কোনো শিরোপা জিততে না পারলেও শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে ওঠে। ষোলোটি প্রতিযোগিতায় খেলে তারা দুইবার ফাইনালে ওঠে এবং নয়বার শেষ চারে জায়গা করে নেয়। সুপার পাঁচশ, সাতশ পঞ্চাশ ও হাজার স্তরের মঞ্চে কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে নিয়মিত উপস্থিতি ছিল তাদের। অনেক সময় ভারতীয় চ্যালেঞ্জের শেষ নামও ছিল এই জুটি। শিরোপায় রূপ না পেলেও এই ধারাবাহিকতা ভারতের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আবার একই সঙ্গে গভীরতার অভাবও স্পষ্ট করে তোলে।
মুহূর্ত ছিল, গতি ছিল না
পুরুষ এককে বছরের শুরুতে ভারতের বড় আশা ছিলেন লক্ষ্য সেন। অস্ট্রেলিয়া ওপেনে তার শিরোপা জয় কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। কঠিন সেমিফাইনাল আর চাপের ম্যাচ পেরিয়ে সেই জয় এলেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। একটির পর একটি প্রতিযোগিতায় একই ছন্দ বজায় রাখতে না পারায় র্যাঙ্কিং ও বড় মঞ্চে প্রভাব পড়ে।
অভিজ্ঞ শ্রীকান্ত ও প্রণয়ের ক্ষেত্রেও চিত্র প্রায় একই। মালয়েশিয়া মাস্টার্সে শ্রীকান্তের ফাইনাল পর্যন্ত ওঠা পুরোনো প্রতিভার ঝলক দেখালেও সেটি ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ধারাবাহিক আগ্রাসন ধরে রাখতে না পারার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। তরুণদের মধ্যেও কিছু চমক দেখা গেলেও নিয়মিত সাফল্য আসেনি। এই জায়গাতেই ভারতের পুরুষ এককের মূল সংকট প্রকট।
সিন্ধু পরবর্তী সময়ের অনিশ্চয়তা
নারী এককে পিভি সিন্ধুর বছরটি ছিল হতাশার। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এগিয়ে থেকেও হার মানার দৃশ্য বারবার ফিরেছে। অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ছন্দ হারানো বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সিন্ধুর অবসর এখনই নয়, তবে তার পরবর্তী যুগের প্রস্তুতি যে এখনও স্পষ্ট নয়, তা ক্রমেই পরিষ্কার।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু তরুণ নাম আলো ছড়িয়েছে। উনাতি হুডার চমকপ্রদ জয় এবং তানভি শর্মার সাহসী পারফরম্যান্স সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তবু এগুলো বিচ্ছিন্ন সাফল্য। নিয়মিত শেষ চারে পৌঁছানোর মানসিকতা ও শারীরিক প্রস্তুতি এখনও পূর্ণতা পায়নি।
দ্বৈত বিভাগে সীমা ও সম্ভাবনা
নারী দ্বৈতে ত্রিসা জলি ও গায়ত্রী গোপীচাঁদের পারফরম্যান্সে নিয়ন্ত্রণ ছিল, আক্রমণের ধার কম। বড় দেশের জুটির বিপক্ষে সেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। মিশ্র দ্বৈতে তানিশা ক্রাস্তো ও ধ্রুব কাপিলার কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ওঠা অবশ্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।
গভীরতার ঘাটতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
চীন, জাপান বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো একসঙ্গে একাধিক খেলোয়াড়কে শেষ পর্যায়ে তুলতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে ভরসা থাকে এক বা দুই নামের ওপর। তারা ব্যর্থ হলে পুরো সপ্তাহটাই ফুরিয়ে যায়। সাত্বিক ও চিরাগের শিরোপা হীন ধারাবাহিকতাই যখন বছরের সেরা অর্জন হয়ে দাঁড়ায়, তখন বোঝা যায় কাঠামোগত সংকট কতটা গভীর।
নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আশ্বাস থাকলেও ফল পেতে সময় লাগবে। আপাতত ভারতের ব্যাডমিন্টন বিশ্ব মঞ্চে উপস্থিত, কিন্তু প্রান্তিক। এই উপস্থিতিকে টেকসই করতে হলে শুধু একটি জুটির ওপর নির্ভরতা ভাঙতেই হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















