জানুয়ারির শুরুতেই নাটকীয় মোড় নেয় লাতিন আমেরিকার রাজনীতি। ক্ষমতাচ্যুত হন নিকোলাস মাদুরো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন তাঁর লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবসা বহু বছর ধরে ধ্বংসপ্রাপ্ত, আর আমেরিকা চাইলে বিপুল অর্থ ঢেলে অবকাঠামো ঠিক করে আবার লাভের পথে ফিরতে পারে দেশটি। এই ঘোষণার ভেতরে ছিল পুরোনো ক্ষোভের স্বাদও। একসময় হুগো চাভেজের শাসনে ভেনেজুয়েলা যেসব পশ্চিমা কোম্পানির সম্পদ জাতীয়করণ করেছিল, তার ক্ষতিপূরণ দাবি আজও ঝুলে আছে আন্তর্জাতিক আদালতে।
তেলের বিনিময়ে প্রতিশোধের রাজনীতি
মাদুরো অপসারণের পরপরই ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমেরিকার হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়। এই তেলের বাজারমূল্য কয়েকশ কোটি ডলারের কাছাকাছি। আমেরিকার জ্বালানি দপ্তরের বক্তব্য, ভেনেজুয়েলা থেকে যে তেল বেরোবে, তা অনির্দিষ্টকাল আমেরিকাই বাজারজাত করবে এবং আয় জমা পড়বে তাদের নিয়ন্ত্রিত হিসাবে। এতে বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল প্রতিশোধ নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল।
উৎপাদন ধস ও অবরুদ্ধ বাস্তবতা
তবে কাগজে-কলমে যতটা সহজ, মাঠের বাস্তবতা ততটাই কঠিন। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের অভাবে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন বিশ্ববাজারের সামান্য অংশমাত্র। সাম্প্রতিক নৌ অবরোধ ও জাহাজ জব্দের ঘটনায় রপ্তানি কার্যত থমকে আছে। প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের ঘাটতিও প্রকট, যা ছাড়া ভেনেজুয়েলার অতিভারী তেল পরিবহনযোগ্য হয় না। ফলে অবরোধ না উঠলে উৎপাদন আরও কমার আশঙ্কাই বেশি।

পুনরুদ্ধারের আশ্বাস ও বিনিয়োগের প্রশ্ন
রাজনৈতিক রূপান্তর মসৃণ হলে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে। বিদ্যমান কূপে রক্ষণাবেক্ষণ আর সীমিত অবকাঠামো উন্নয়নে আগামী এক দুই বছরে উৎপাদন কিছুটা বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে কিছু আমেরিকান বিনিয়োগকারী তহবিল গঠনের চেষ্টা করছে। কিন্তু বড় ছবিতে ফিরতে হলে দরকার বিপুল অর্থ, দক্ষ জনবল আর স্থিতিশীল বাজার।
অতিভারী তেল ও বাজারের দেয়াল
ভেনেজুয়েলার তেলের বড় অংশই অতিভারী, যা তুলতে খরচ বেশি এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এমন সময়ে বিশ্ববাজারে তুলনামূলক সস্তা ও পরিষ্কার তেলের জোগান রয়েছে। বড় তেল কোম্পানিগুলোও অতীতের অভিজ্ঞতা ভুলে যায়নি। আইনি ঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা আর ভঙ্গুর অর্থনীতি তাদের দূরে রাখছে। ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনীহাও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা।
জনশক্তির সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা
দীর্ঘ সংকটে ভেনেজুয়েলা হারিয়েছে হাজার হাজার দক্ষ প্রকৌশলী ও ভূতত্ত্ববিদ। রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা এখন মূলত সামরিক নিয়ন্ত্রণে। আন্তর্জাতিক মানের যৌথ উদ্যোগ গড়তে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে আমূল সংস্কারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ।

বিশ্ববাজারে তেলের ভিড়
আরও একটি বাস্তবতা হলো বৈশ্বিক জোগান। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই দশকের শেষ পর্যন্ত চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি থাকবে। নতুন নতুন দেশ উৎপাদন বাড়াচ্ছে, ফলে দাম নেমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। কম দামে ভেনেজুয়েলার বহু প্রকল্পই লাভজনক নয়। বড় নতুন প্রকল্পগুলোর ফল মিলতে সময় লাগবে বহু বছর, তখন হয়তো তেলের চাহিদাই চূড়ায় পৌঁছে যাবে।
স্বপ্ন আর বাস্তবতার ব্যবধান
সব মিলিয়ে আমেরিকার লাভ সীমিতই হতে পারে। চীনসহ বড় ক্রেতারা সহজেই বিকল্প উৎস খুঁজে নিতে পারবে। দক্ষিণ আমেরিকার তেল বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের তেল ভাবনা এখনও পুরোনো যুগে আটকে আছে। ভবিষ্যতের শক্তি বাস্তবতায় এই পরিকল্পনা কতটা টিকবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















