রাষ্ট্রপ্রধানের পতন সাধারণত বাজারে আস্থা ফেরায় না। তবু ভিন্ন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা-তে। মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটির সরকারি ঋণপত্রে হঠাৎ করেই বিনিয়োগকারীদের ভিড় বেড়েছে। দশ বছর মেয়াদি বন্ডের দাম এক লাফে ডলারের প্রতি ৩৩ সেন্ট থেকে উঠে গেছে ৪৩ সেন্টে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় উত্থান।
বাজার চাঙা, বাস্তবতা কঠিন
এই উত্থান দেখে মনে হলেও ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী, বাস্তব চিত্র মোটেও তেমন নয়। ২০১৭ সালের পর থেকে দেশটি প্রায় সব ঋণেই খেলাপি। তেলের বিক্রি কমে যাওয়ায় অর্থনীতি আরও সংকুচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি বছরে দেশটির উৎপাদন আবারও কমতে পারে। তেলই যেখানে প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস, সেখানে এই পতন ঋণ শোধের পথ আরও সংকীর্ণ করে তুলছে।
সস্তা ঋণ, বড় ঝুঁকি
দীর্ঘদিনের খেলাপির কারণে ভেনেজুয়েলার ঋণ এখন এতটাই সস্তা যে কয়েক সেন্ট ফেরত পাওয়ার আশাও অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে লাভজনক মনে হচ্ছে। আগে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাদুরো সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথ বন্ধ ছিল। এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও ঋণ পুনর্গঠন সহজ হবে না। মোট ঋণের পরিমাণ অন্তত পঁচানব্বই বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট উৎপাদনের চেয়েও বেশি।

তিন ভাগে ঋণদাতা
সবচেয়ে বড় অংশ বেসরকারি বন্ডধারীদের কাছে, যাদের পাওনা কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার। এদের অনেকেই সংকটগ্রস্ত সম্পদ কিনে মুনাফা করার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কারা ঠিক কতটা ঋণ ধরে রেখেছে, তা স্পষ্ট নয়। এই অস্বচ্ছতাই আলোচনাকে ধীর করে দেবে।
আরেক বড় বোঝা তেল কোম্পানিগুলোর দাবি। একসময় তেল শিল্প রাষ্ট্রায়নের ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আদালতের রায়ে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক সুদে আসলে আরও ফুলে উঠেছে। এই পাওনা মেটাতে গেলে সরকারের কাঁধে বাড়তি চাপ পড়বে।
তৃতীয় ও সবচেয়ে সংবেদনশীল ঋণদাতা হলো চীন। পশ্চিমা দেশগুলো মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সময় বেইজিং বিপুল ঋণ দেয়, বিনিময়ে ছাড়ে তেল নেওয়ার শর্তে। এমন চুক্তি আগে কোথাও পুনর্গঠিত হয়নি। ফলে আলোচনা আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তেল রাজনীতি ও নতুন হিসাব
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে তেলই মূল আকর্ষণ। ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললেও অর্থের জোগান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তেল কোম্পানিগুলোকে বড় অঙ্কের অর্থ দিলে তারা ফিরতে পারে, আবার আলোচনায় দেরি হলে নতুন ধরনের তেল-ঋণ সমঝোতার চাপও আসতে পারে।
নগদের অভাব, পথের সংকট
ঋণ পুনর্গঠনের জন্য যে নগদ দরকার, তা ভেনেজুয়েলার হাতে নেই। বছরের পর বছর ঋণ না শোধ করেও বাজেটে উদ্বৃত্ত তৈরি হয়নি। চীন নতুন ঋণ দিচ্ছে না, আর যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি অর্থ সহায়তায় আগ্রহী নয়। এই অবস্থায় যে কোনো সমঝোতা শুরু হওয়ার আগেই থমকে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলার ঋণ তাই আপাতত সস্তা নয়, বরং মূল্যহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতেই আছে। খেলাপি দেশগুলোর সংকট নতুন নয়, তবে বেরিয়ে আসার পথ এতটাই সীমিত—এমন উদাহরণ খুব কমই রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















