কিউবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে গভীর সংকটের ছবি। তবে এই সংকট দেশটির দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলবে কি না, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি তারা। গোপন এসব প্রতিবেদনের সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্রের বরাতে এমন তথ্য জানা গেছে।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কিউবার কৃষি ও পর্যটন খাত মারাত্মক চাপে রয়েছে। ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা অর্থনীতিকে প্রায় অচল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা। কয়েক দশক ধরে যে দেশটি কিউবার প্রধান জ্বালানি যোগানদাতা ছিল, সেই সহায়তা হ্রাস পেলে হাভানার জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়নি, এই অর্থনৈতিক দুরবস্থা সরকারের পতনের দিকে নিয়ে যাবে কি না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি যতই ভয়াবহ হোক না কেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন অনিবার্য—এমন কোনো সিদ্ধান্তে তারা পৌঁছাননি।
ট্রাম্পের মন্তব্য ও বাস্তবতা
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের পর কিউবা পতনের জন্য প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, ভেনেজুয়েলার তেল বন্ধ হয়ে গেলে কিউবার আয়ের পথও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে গোয়েন্দা বিশ্লেষণে এই বক্তব্যের সরাসরি সমর্থন পাওয়া যায়নি।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশটির তেলের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে কিউবার জ্বালানি সংকট আরও তীব্র আকার নিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল আসার সময়ও কিউবার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। এখন সেই সরবরাহ বন্ধ হলে সংকটের মাত্রা আরও বাড়বে।

অর্থনৈতিক চাপ কতটা বিপজ্জনক
কিউবার অর্থনীতি বহু বছর ধরেই দুর্বল। কঠোর রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ দেশটিকে ভুগিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং মহামারির পর পর্যটন খাতের ধস এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাভানার বাইরে অনেক এলাকায় দিনে গড়ে প্রায় বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এমন পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, নব্বইয়ের দশকের বিশেষ দুর্দশার সময়ের মতো ভয়াবহ অবস্থায় এখনো দেশটি পৌঁছায়নি, তবুও সাধারণ মানুষের জীবনযাপন চরমভাবে বিপর্যস্ত।
জনসংখ্যা হ্রাস ও রাজনৈতিক প্রভাব
গোয়েন্দা বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিউবা থেকে বিপুলসংখ্যক তরুণ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। পঞ্চাশ বছরের নিচে বয়সী মানুষের এই প্রস্থান দেশটির জনসংখ্যাগত কাঠামোকে বদলে দিয়েছে। তরুণদের অভাব রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতি শ্লথ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে কয়েক বছর আগে কিউবার জনসংখ্যা ছিল এক কোটির বেশি। তবে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা এখন নয় মিলিয়নের নিচে নেমে এসেছে।
ক্ষুধা, ভয় ও প্রতিবাদের দ্বন্দ্ব
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হলেও তা সরাসরি সরকার পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। বর্তমান নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা আগের ঐতিহাসিক নেতার মতো নয়। তবে যখন মানুষ প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই ব্যস্ত থাকে, তখন রাজনীতি তাদের প্রধান ভাবনার বিষয় হয় না।
অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী হতাশা একসময় ভয় কাটিয়ে রাস্তায় নামার শক্তিও জোগাতে পারে। কিউবার বর্তমান সংকট ঠিক কোন পথে মোড় নেবে, সে বিষয়ে তাই এখনো অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















