সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে টানা কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অবশেষে শহর ছেড়েছে কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর শেষ দলটি। যুদ্ধবিরতির এক সমঝোতার আওতায় রোববার আলেপ্পোর আশরাফিয়াহ ও শেখ মাকসুদ এলাকা থেকে যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সরিয়ে নেওয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
এই প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে দুই হাজার এগারো সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে আলেপ্পোর যেসব অংশ কুর্দি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেগুলোর অধ্যায় শেষ হলো। তবে দেশটির উত্তর ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলে কুর্দিদের আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন বহাল থাকছে।
যুদ্ধবিরতি ও প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া
কুর্দি বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার মাজলুম আবদি জানান, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতায় পৌঁছানো হয়। এর আওতায় আলেপ্পোর আশরাফিয়াহ ও শেখ মাকসুদ এলাকা থেকে বেসামরিক মানুষ ও যোদ্ধাদের নিরাপদে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েক দিনের সংঘর্ষে শহরের পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল।
রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রতিরোধ
আলেপ্পোর এই সহিংসতা সিরিয়ার বড় রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে। দীর্ঘ যুদ্ধের পর দেশকে এক নেতৃত্বের অধীনে আনতে নতুন সরকারের ঘোষণার বিরোধিতা করে আসছিল কুর্দি পক্ষ। যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও তারা শেখ মাকসুদ এলাকা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে সেনাবাহিনী স্থল অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয় এবং এলাকা তল্লাশি চালায়।

বাস্তুচ্যুতি ও আত্মসমর্পণের দাবি
ঘটনাস্থলে দেখা যায়, নারী পুরুষ ও শিশুসহ অসংখ্য মানুষ হেঁটে এলাকা ছাড়ছেন। তাদের বাসে করে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়। চলতি সপ্তাহের সংঘর্ষে এক লক্ষ চল্লিশ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনী শতাধিক বেসামরিক পোশাকধারী পুরুষকে বাসে তুলেছে। কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা কুর্দি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং আত্মসমর্পণ করেছে। তবে কুর্দি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সবাই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষ।
আন্তর্জাতিক আহ্বান ও মধ্যস্থতার চেষ্টা
মার্কিন দূত দামেস্কে সিরিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানো, অবিলম্বে সংঘর্ষ বন্ধ এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান। শান্তিপূর্ণভাবে কুর্দি বাহিনীর প্রত্যাহারের পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ অব্যাহত ছিল।
তুরস্ক ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ইঙ্গিত
তুরস্কের নিরাপত্তা সূত্রগুলো কুর্দি গোষ্ঠীর ভেতরে মতভেদের ইঙ্গিত দেয়। তাদের দাবি, কিছু শীর্ষ নেতা সমঝোতার পথে আগ্রহী হলেও অন্যরা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে অবস্থান নেওয়া কুর্দি যোদ্ধারাও চুক্তির আওতায় অস্ত্র রেখে এলাকা ত্যাগ করে।
অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ
কুর্দি বাহিনীর অভিযোগ, বেসামরিক স্থাপনায় নির্বিচার হামলা হয়েছে এবং এতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। তুরস্ক এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সিরীয় সেনাবাহিনীও নির্বিচার হামলার কথা নাকচ করে পাল্টা অভিযোগ তোলে যে কুর্দি বাহিনী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সহিংসতার দীর্ঘ ছায়া
নতুন সরকারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আলোচনা স্থবির থাকায় মঙ্গলবার সংঘর্ষ শুরু হয়, এতে অন্তত নয়জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনাও দেশটিকে অস্থির করে তুলেছে।
অর্থনীতি ও যোগাযোগে প্রভাব
সংঘর্ষের কারণে তুরস্কগামী একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বন্ধ হয়ে গেছে এবং শিল্প এলাকায় কারখানার কার্যক্রম স্থবির। আলেপ্পোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















