২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে আবারও উত্তাল ইরান। তেহরান সহ বিভিন্ন শহরে হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, দেশটি কি আরেক দফা রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে। প্রথম দেখায় অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে জন্ম নেওয়া এই প্রতিবাদ খুব দ্রুতই রাজনৈতিক অর্থ বহন করতে শুরু করেছে, যার পেছনে রয়েছে ভেতরের চাপের পাশাপাশি বাইরের শক্তির সক্রিয় উপস্থিতি।
অর্থনৈতিক চাপের বিস্ফোরণ
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার এলাকায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় নামেন ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। ইরানি রিয়ালের রেকর্ড পতন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রায় অচল করে দেয়। খোলা বাজারে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর দাঁড়ায় প্রায় চৌদ্দ লাখের কাছাকাছি। প্রতিদিনই পণ্যের দাম নতুন করে নির্ধারণ করতে হচ্ছে, ফলে ব্যবসা চালানোই হয়ে পড়ে অনিশ্চিত।
এই পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। গ্রীষ্ম জুড়ে চরম তাপপ্রবাহ, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এবং বিভিন্ন প্রদেশে সাময়িক বিধিনিষেধ সমাজে জমে থাকা ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। শরৎকালে এসে পানিসংকট নিয়ে আলোচনা আরও গভীর হয়, যেখানে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অর্থনীতি থেকে রাজনীতির পথে
প্রথম দিকে বিক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল নিত্যপণ্যের দাম, মুদ্রার মান ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কিন্তু এক দুই দিনের মধ্যেই স্লোগানের ভাষা বদলাতে শুরু করে। বাজারের অস্থিরতার চেয়েও রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন ভিডিওতে শোনা যায়, গাজা বা লেবাননের জন্য নয়, ইরানের জন্যই বাঁচতে চায় মানুষ। এই স্লোগান অর্থনৈতিক ক্ষোভকে রূপ দেয় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পথচলার প্রশ্নে।
ইরানে এমন দৃশ্য নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক বিক্ষোভের সূচনা হয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে। মূল্যবৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া, সেবা সংকট এবং সম্পদ বন্টনের বৈষম্য মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে। কিন্তু এসব আন্দোলন খুব দ্রুতই শাসনব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে বিতর্কে পরিণত হয়েছে, কারণ সাধারণ মানুষের চোখে অর্থনৈতিক সংকট কখনোই নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে মনে হয় না।
বাইরের প্রভাবের ছায়া
এই বিক্ষোভ ঘিরে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রশ্নও জোরালো। ইরানি কর্তৃপক্ষ বরাবরই বাইরের শক্তির দিকে আঙুল তোলে। অন্যদিকে প্রবাসী বিরোধী গোষ্ঠী ও বিভিন্ন নেটওয়ার্ক সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনের দৃশ্য তুলে ধরে আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়াতে সক্রিয় থাকে। ফলে দৈনন্দিন কষ্ট থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ দ্রুতই রাজনৈতিক রূপ পায়।
বিশ্ব পরিস্থিতিও এই প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করেছে। করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন, জ্বালানি রূপান্তর এবং সামরিক সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়েই চাপ বাড়িয়েছে। যেসব দেশে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা আগে থেকেই দুর্বল, সেখানে অর্থনৈতিক চাপ সহজেই রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়। ইরানের ঘটনাও সেই ধারার বাইরে নয়।
যুদ্ধের পরবর্তী বাস্তবতা
২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে বারো দিনের সরাসরি সংঘাত এই পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়। যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে ইরানের ভেতরের দুর্বলতাকে বড় পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে। প্রকাশ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলের সম্ভাবনার কথা বলেন এবং ইরানি জনগণকে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
পশ্চিমা ও ইসরায়েলি আলোচনায়ও ক্ষমতা পরিবর্তনের বিষয়টি ক্রমেই উচ্চারিত হতে থাকে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এ নিয়ে সতর্কতার কথাও শোনা যায়। এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসী ইরানি গোষ্ঠী ও বিরোধী নেটওয়ার্ক তথ্যযুদ্ধে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কেউ কেউ আশা করেছিল, সামরিক সংঘাতই বড় গণঅসন্তোষের আগুন জ্বালাবে। বিপরীতে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুদ্ধের পরপরই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার আশঙ্কায় কঠোর অবস্থান নেয়।

বিরোধী শক্তির ভিন্ন ভিন্ন ধারা
ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই সংকটকে সুযোগ হিসেবে দেখেছে। কুর্দি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সরকার পরিবর্তনের দাবি জোরালো হলেও সবার অবস্থান এরকম ছিল না। যুদ্ধের পর সরকার এসব এলাকায় চাপ বাড়ায়। একই সঙ্গে রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠী ও রেজা পাহলভির নাম আবার আলোচনায় আসে। যদিও দেশের ভেতরে রাজতন্ত্র পুনর্বহালের সমর্থন কতটা, তা স্পষ্ট নয়।
ইতিহাসের স্মৃতি এখানেই বড় ভূমিকা রাখে। অনেক ইরানির কাছে রাজতন্ত্রের সময়কাল কঠোর নিরাপত্তা ও সামাজিক বৈষম্যের স্মৃতি বহন করে। আবার ১৯৭৯ সালের বিপ্লব এক সময় ন্যায়ভিত্তিক সমাজের আশা জাগিয়েছিল। বর্তমান ব্যবস্থার সমালোচকরাও প্রায়ই বাইরের চাপ থেকে আসা ক্ষমতা বদলের আহ্বানকে সন্দেহের চোখে দেখেন, বিশেষ করে যখন তা যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে আসে।

ভেতরের অসন্তোষের বাস্তবতা
সবকিছুকে কেবল বিদেশি ষড়যন্ত্রে নামিয়ে আনা ঠিক নয়। বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের দাবি জমে উঠেছে। আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে খুব একটা বদল আনেনি, অথচ বিপুল সম্পদ ব্যয় হয়েছে নিরাপত্তা ও বাইরের অঙ্গীকারে। এই বাস্তবতা বিক্ষোভের মাটিকে উর্বর করেছে, যেখানে বাইরের শক্তি সহজেই নিজেদের বর্ণনা জোরালো করতে পারে।
সামনের ঝুঁকি
ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত এখনো শেষ অধ্যায়ে পৌঁছায়নি। যুদ্ধবিরতির পরও ২০২৬ সালে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা রয়ে গেছে। সামান্য ভুল হিসাবও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বৈঠক নতুন করে উদ্বেগ বাড়ায়। ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল অব্যাহত থাকলে অভ্যন্তরীণ সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















