কারাগারের ভেতর থেকে একের পর এক মৃত্যুসংবাদ আসছে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে বন্দি অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ূন কবিরের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে কারা হেফাজতে থাকা রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা। গত কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত চারজন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। প্রতিটি ঘটনাই আলাদা হলেও মিল রয়েছে একটি জায়গায়—সবাই ছিলেন কারাগারে বন্দি।
নারায়ণগঞ্জে হুমায়ূন কবিরের মৃত্যু
নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি হুমায়ূন কবির ১৩ জানুয়ারি সকালে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আগের রাতে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি আগে থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি মামলায় গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পাবনায় প্রলয় চাকীর মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক
এর কয়েক দিন আগেই পাবনা জেলা কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যান আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রলয় চাকী। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। পরিবার অভিযোগ করে, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পরও সময়মতো উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষ অবশ্য চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পাবনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
নওগাঁ কারাগারে আব্দুর রশিদের মৃত্যু
চলতি জানুয়ারির শুরুতে নওগাঁ জেলা কারাগারে বন্দি আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রশিদ অসুস্থ হয়ে মারা যান। হৃদ্রোগজনিত জটিলতার কথা জানানো হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তার শারীরিক অবস্থার অবনতি আগেই জানানো হয়েছিল। বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি কারাগারে ছিলেন।
কাশিমপুরে ওয়াসিকুর রহমান বাবুর মৃত্যু
গত ডিসেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যান আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াসিকুর রহমান বাবু। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। এই ঘটনাও তখন মানবাধিকার ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছিল।
মিল কোথায়
চারটি ঘটনার বিবরণে একটি সাধারণ বিষয় সামনে আসে—সব ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে বন্দিরা আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, কারাগারে থাকা অবস্থায় তাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, দ্রুত চিকিৎসা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না। পরিবারের অভিযোগ ও কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়ে গেছে।

রাজনৈতিক ও মানবাধিকার উদ্বেগ
একাধিক আওয়ামী লীগ নেতার কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বন্দি অবস্থায় যেকোনো মৃত্যুর ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত জরুরি। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ অবহেলা বা বৈষম্যের শিকার হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
এই মৃত্যুগুলো কি কেবল অসুস্থতার স্বাভাবিক পরিণতি, নাকি কারা ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতার প্রতিফলন—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। একের পর এক ঘটনা কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থা, জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং বন্দিদের অধিকার নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা উসকে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















