ইরানে চলমান রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মিলছে। একই সঙ্গে আলোচনার পথ বন্ধ না থাকার বার্তা দিচ্ছে তেহরান। ব্যাপক বিক্ষোভ, প্রাণহানি আর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ওয়াশিংটনের কঠোর ভাবনা, নতুন শুল্কের হুমকি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি নানা বিকল্প বিবেচনা করছেন। সামরিক পদক্ষেপও সেই তালিকায় রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা যেকোনো দেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে পঁচিশ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। তবে কী আইনি ভিত্তিতে এই শুল্ক কার্যকর হবে বা কোন কোন দেশের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

ইরান ইতিমধ্যেই কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। দেশটির বেশির ভাগ তেল রপ্তানি যায় চীনে। তুরস্ক, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতও ইরানের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ট্রাম্পের ঘোষণার পর চীনের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। বেইজিং বলেছে, তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করবে।
আলোচনার বার্তা দিচ্ছে তেহরান
সব উত্তেজনার মধ্যেও ইরান বলছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের চ্যানেল খোলা রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিক্ষোভের আগে ও পরেও ছিল এবং এখনও তা চলছে। তবে তিনি বলেন, আলোচনার প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হুমকির অসঙ্গতি রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্টের প্রথম পছন্দ কূটনীতি। প্রশাসনের মুখপাত্র বলেন, প্রকাশ্যে ইরান যা বলছে, আড়ালে তারা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। সেই বার্তাগুলো যাচাই করতেই আগ্রহী ট্রাম্প।

প্রাণহানি ও গ্রেপ্তার বাড়ছে
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছে দশ হাজারের বেশি মানুষ। এই সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট।
তেহরানের প্রধান কবরস্থানে নিহতদের স্বজনেরা জড়ো হয়ে স্লোগান দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। তবে বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশটির ভেতর থেকে তথ্য আসা কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমিত সংখ্যক মানুষ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।
সরকারের অবস্থান ও পাল্টা অভিযোগ
ইরানের সরকার দাবি করছে, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেছে, যারা মসজিদে আগুন দেওয়া ও নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলার সঙ্গে জড়িত। পার্লামেন্টের স্পিকার বলেন, ইরান একসঙ্গে অর্থনৈতিক, মানসিক, সামরিক ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মুখোমুখি।

সরকারি ভাষ্যে এই সহিংসতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদে সৃষ্ট ষড়যন্ত্রকে দায়ী করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে নিরাপত্তা বাহিনীর নিহতদের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভাঙনের আভাস নেই, তবে ক্ষোভ গভীর
এত বড় বিক্ষোভের পরও ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে ভাঙনের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিরোধী শক্তিও বিভক্ত, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। তবু দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তীব্র হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাধর বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিপুল ব্যবসায়িক প্রভাব নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে।
সামরিক ঝুঁকি ও আঞ্চলিক প্রভাব
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তবে পরিস্থিতি খারাপ হলে পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে আলোচনা চলছে সাইবার আক্রমণ থেকে শুরু করে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে। তবে জনবহুল এলাকায় অবস্থিত সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা হলে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

গত বছরের যুদ্ধে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমেছে। মিত্র গোষ্ঠীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই উত্তেজনার প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক বাজারেও। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপের আশঙ্কায় তেলের দাম বেড়েছে।
উত্তাল ভবিষ্যৎ
ইরানের এই বিক্ষোভ কেবল মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হলেও এখন তা শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তেহরানের সামনে পথ বেছে নেওয়া সহজ নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















