শীতকালীন চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। সারাবছরের হিসাবে দাম কমেছে প্রায় ত্রিশ শতাংশ। এ অবস্থাকে গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম এখন প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপ এককে মাঝামাঝি নয় ডলারের সমপর্যায়ে নেমে এসেছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে জানুয়ারির শুরু পর্যন্ত সময়ে, যখন শীতের কারণে গ্যাসের চাহিদা বেশি থাকার কথা, তখনই এই দরপতন ঘটেছে। দুই হাজার বিশ সালের পর এই প্রথম শীতকালে দাম দশ ডলারের নিচে নামল।
রপ্তানিতে রেকর্ড, সরবরাহের চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহই দামের এই পতনের প্রধান কারণ। গত বছরে বৈশ্বিক এলএনজি রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চারশ ঊনত্রিশ মিলিয়ন মেট্রিক টনে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এর বড় অংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। দেশটি থেকে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় পঁচিশ শতাংশ। প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক এলএনজি রপ্তানি একশ মিলিয়ন টনের সীমা ছাড়িয়েছে। লুইজিয়ানায় নতুন রপ্তানি প্রকল্প পুরো দমে উৎপাদনে যাওয়ায় এই বৃদ্ধি হয়েছে।

একই সঙ্গে কাতার থেকেও রপ্তানি বেড়েছে। তরলীকরণ অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে দেশটির রপ্তানি সামান্য হলেও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। চলতি বছরে এই দুই দেশ থেকে রপ্তানি আরও বাড়ার আভাস রয়েছে। জানুয়ারি মাসেই বৈশ্বিক রপ্তানি মাসিক হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এশিয়ায় চাহিদা কমছে
সরবরাহ বাড়লেও এশিয়ায় চাহিদা উল্টো কমেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি আমদানিকারক অঞ্চল এশিয়ায় গত বছর আমদানি কমেছে প্রায় চার শতাংশ। এই পতন সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে চীনে। দেশটির আমদানি কমেছে প্রায় পনেরো শতাংশ। দামের ঊর্ধ্বগতির বছর দুই হাজার বাইশ এর পর এটাই শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বড় পতন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানি বাড়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমেছে। এর পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপোড়েনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কেনা কার্যত বন্ধ রেখেছে বেইজিং।
রাশিয়ার সস্তা গ্যাসে বাজারে প্রভাব
চীন এখন মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে বেশি এলএনজি নিচ্ছে। গত আগস্টে রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলের একটি প্রকল্প থেকে প্রথম চালান চীনে পৌঁছায়। পরে ডিসেম্বর মাসে বাল্টিক সাগর এলাকার আরেকটি স্থাপনা থেকেও গ্যাস পাঠানো হয়। এসব প্রকল্পের ওপর আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও চীনের ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চীন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ এলএনজি বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় চল্লিশ শতাংশ কম দামে কিনছে। এই সস্তা গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত থাকলে বাজারে সরবরাহ আরও ঢিলেঢালা হবে এবং দামের ওপর চাপ বাড়বে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুধু একটি রুশ প্রকল্প থেকেই আগামী বছরে রপ্তানি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
![Japan: future uncertainty, but potential upside [LNG Condensed]](https://www.naturalgasworld.com/images/Screen%20Shot%202019-03-21%20at%208_24_46%20AM.png)
জাপানে বিদ্যুৎ দামে প্রভাব
জাপানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি এলএনজি হওয়ায় বাজারের এই পরিবর্তন সরাসরি বিদ্যুৎ দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। টোকিও বাজারে বিদ্যুৎ ফিউচার দর গত নভেম্বরের শেষ দিক থেকে প্রায় দশ শতাংশ কমেছে। এর পেছনে পারমাণবিক কেন্দ্র পুনরায় চালু হওয়া এবং জ্বালানির কম দামের প্রত্যাশা কাজ করছে।
যদিও জাপানের বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তেলভিত্তিক দরে এলএনজি আমদানি করে, তবু বাজারে বিদ্যুৎ দর কম থাকলে ভোক্তাদের জন্য ভবিষ্যতে বিল কমার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে বাজারদর খুব বেশি নেমে গেলে কোম্পানিগুলোর লাভের মার্জিন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















