ইরানে টানা দমন-পীড়নের পর আপাতত স্তিমিত হয়ে এসেছে বিক্ষোভ। রাজধানী তেহরানের একাধিক বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববারের পর শহরে আর বড় কোনো আন্দোলনের চিহ্ন দেখা যায়নি। তবে রাজপথের এই নীরবতার আড়ালে রয়েছে কড়া নিরাপত্তা, ড্রোন নজরদারি এবং গ্রেপ্তারের ধারাবাহিকতা, যা নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
তেহরানে নীরবতা, আকাশে ড্রোন
তেহরানের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রোববারের পর থেকে শহরটি অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কোথাও প্রকাশ্য বিক্ষোভ চোখে পড়েনি। তবে শহরের আকাশে নিয়মিত ড্রোন উড়তে দেখা যাচ্ছে, যা নজরদারি আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, রাজপথ শান্ত হলেও মানুষের মনে ভয় কাজ করছে।

মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণ
নরওয়ে ভিত্তিক ইরানি কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে, রোববারের পর আর কোনো বড় বিক্ষোভ সমাবেশ হয়নি। তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত কঠোর। যেসব শহর ও এলাকায় আগে বিক্ষোভ হয়েছিল, সেখানে ভারী সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে তাদের স্বাধীন সূত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও কূটনৈতিক তৎপরতা
এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানে হত্যাকাণ্ড কমছে বলে তাকে অবহিত করা হয়েছে। এর পর থেকেই সম্ভাব্য মার্কিন হামলার ভয় কিছুটা প্রশমিত হয়। একই সময়ে সৌদি আরব ও কাতারসহ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সক্রিয় কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়েছে। উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা জানান, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন যে হামলা হলে পুরো অঞ্চলে এর গুরুতর প্রভাব পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

হোয়াইট হাউসের সতর্কবার্তা
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আরও রক্তপাত হলে তেহরানকে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলে ট্রাম্প ও তার দল সতর্ক করেছে। মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট বলেন, নির্ধারিত আটশ’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত হয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট অবগত আছেন এবং পরিস্থিতি নজরে রেখে সব বিকল্প খোলা রাখা হয়েছে।
দমন-পীড়নের ভয়াবহ ব্যক্তিগত গল্প
যোগাযোগ ব্যবস্থা আংশিক স্বাভাবিক হওয়ার পর সহিংসতার নতুন বিবরণ সামনে আসছে। তেহরানের এক নারী ফোনে জানান, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর তার পনেরো বছর বয়সী মেয়েকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েটি কোনো দাঙ্গাবাজ ছিল না। বাসিজ বাহিনী তাকে বাড়ি ফেরার সময় ধাওয়া করেছিল। এই ব্যক্তিগত বর্ণনাগুলো দমন-পীড়নের মানবিক দিকটি আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

বিক্ষোভের পটভূমি
ডিসেম্বরের আটাশ তারিখে ইরানে তীব্র মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত অর্থনীতি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। সেই ক্ষোভ দ্রুতই রূপ নেয় ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটিতে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি
এই সংকটের মধ্যে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূতের সঙ্গে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যদিও বাহিনীর ধরন ও সময়সূচি এখনো স্পষ্ট নয়।
শান্ত শহর, চাপা অস্থিরতা
তেহরান ছাড়াও কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতেও আপাত শান্ত পরিবেশের কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। তবে কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্ন অস্থিরতার খবর মিলছে। হেঙ্গাও জানিয়েছে, তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে এক নারী নার্স সরকারি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইসফাহান প্রদেশের একটি জেলায় বিক্ষোভকারীরা শিক্ষা দপ্তরের একটি কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক বৃদ্ধা বাসিন্দা বলেন, সেখানে মাঝে মধ্যে বিক্ষোভ হচ্ছে, তবে আগের মতো তীব্র নয়। আগের সহিংসতার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, এমন দৃশ্য তিনি আগে কখনো দেখেননি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তেহরানের এক ফরেনসিক কেন্দ্রে সারি সারি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















