যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় স্বস্তির আশা জেগেছিল গাজাবাসীর মনে। টানা দুই বছরের ভয়াবহ হামলার পর মনে হয়েছিল, অন্তত ধ্বংস থামবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজাজুড়ে একের পর এক ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বদলে গেছে পুরো এলাকার মানচিত্র।
উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়া নতুন ধ্বংস
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর গাজায় আড়াই হাজারের বেশি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। গাজা শহরের শুজাইয়া এলাকাসহ একাধিক অঞ্চলে রাতের আঁধারে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভবন উড়িয়ে দেওয়ার চিত্রও ধরা পড়েছে। যেসব এলাকায় যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী অভিযান বন্ধ থাকার কথা ছিল, সেখানেও ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে।

হলুদ সীমারেখা পেরিয়েও ভাঙচুর
যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে গাজার ভেতরে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা মানচিত্রে হলুদ রেখা হিসেবে দেখানো হয়। ওই রেখার ভেতরের অংশে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, সীমারেখার বাইরে হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকাতেও বহু ভবন ধ্বংস হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ধ্বংস সীমারেখা থেকে কয়েক শ মিটার দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
টানেল ধ্বংসের যুক্তি
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব ধ্বংসের লক্ষ্য গাজার টানেল নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় করা। তাদের দাবি, বহু বাড়ির নিচে বিস্ফোরক পাতা ছিল এবং সেগুলোর নিচ দিয়ে টানেল বিস্তৃত ছিল। তাই টানেল ধ্বংস করতে গিয়ে ওপরের স্থাপনাও ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধের সময় গাজার নিচে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল ব্যবস্থার কথা স্বীকার করেছিল ইসরায়েল।

বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্ষোভ
গাজার বহু বাসিন্দা মনে করেন, টানেলের অজুহাতে গোটা পাড়া-মহল্লা নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। শুজাইয়ার বাসিন্দা নিভিন নোফাল জানান, নিজের এলাকা গুঁড়িয়ে যাওয়ার খবর শুনে তিনি ভেঙে পড়েছেন। তার ভাষায়, স্বপ্ন আর স্মৃতি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আরেক বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা আশরাফ নাসর বলেন, শৈশবের স্মৃতি মুছে যেতে দেখাটা অসহনীয়।
জাতিসংঘের মূল্যায়ন
জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির আগেই গাজার আশি শতাংশের বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছিল। নতুন করে চলা ভাঙচুরে অবশিষ্ট এলাকাও ঝুঁকিতে পড়ছে। কৃষিজমি, খামার আর গ্রিনহাউসও মুছে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে।

চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ
হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্পষ্ট ছিল এবং এতে মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংসের কোনো সুযোগ নেই। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ সরাসরি শত্রুতামূলক কাজ। অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, শেষ টানেল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
যুদ্ধবিরতির মাঝেও গাজায় যে ধ্বংস চলছে, তা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যারা ঘর হারিয়েছেন, তাদের ফিরে যাওয়ার জায়গা নেই। আর যারা বেঁচে আছেন, তারা আশঙ্কা করছেন—টানেল ধ্বংসের নামে পুরো গাজাই একদিন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















