জ্বালানি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই কৌশলের কেন্দ্রে ছিল ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুতই সেই পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে ভেনিজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব দিতে পারে, তবে এর বিনিময়ে ঝুঁকি ও জটিলতা এতটাই গভীর যে লাভ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভেনিজুয়েলার তেল ও বৈশ্বিক ক্ষমতার হিসাব
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। তাত্ত্বিকভাবে এই দেশের তেল রপ্তানির ওপর প্রভাব বাড়াতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে তেলের দামের ধাক্কা নিয়ে কম চিন্তিত থাকতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকদের প্রভাব কমবে এবং চীনের মতো বড় ভোক্তা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। রাশিয়ার সার্বভৌম তহবিলের প্রধান কিরিল দিমিত্রিয়েভের মতে, এতে ওয়াশিংটনের হাতে বৈশ্বিক তেলবাজারে বিশাল প্রভাব আসতে পারে। অন্যদিকে চীন বিষয়টিকে দেখছে উদ্বেগের চোখে। বেইজিংয়ের আশঙ্কা, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়লে প্রয়োজনে চীনের দিকে তেল ও কৌশলগত সম্পদের সরবরাহ বন্ধ করার ক্ষমতাও তৈরি হতে পারে।

বাস্তব বাধা ও বিনিয়োগের অনীহা
তবে এই বড় কৌশল শুরুতেই বাস্তব সমস্যায় পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় তাৎক্ষণিকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে আগ্রহী নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো জাতীয় তেল কোম্পানি নেই, যা সরাসরি সরকারের নির্দেশে কাজ করতে পারে। ফলে রাশিয়া বা সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার সুবিধা এখানে নেই। উপরন্তু দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও দুর্নীতির কারণে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। উৎপাদন বাড়াতে হলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং বহু বছর সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তেলের যুগ কি বদলে গেছে
এক সময় তেলের সরবরাহে ধাক্কা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ছিল। কিন্তু সেই সময় আর নেই বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদকদের একটি। পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি অনেকটাই অন্য জ্বালানি উৎস নির্ভর হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এমি মায়ার্স জ্যাফের ভাষায়, উনিশশো তিয়াত্তরের তেল সংকটের যুগ শেষ, তেল আর যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার মূল জায়গা নয়। তবু ট্রাম্পের চিন্তায় তেলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়ে গেছে বহু দশক ধরে।

হোয়াইট হাউস ও তেল কোম্পানির টানাপোড়েন
চলতি মাসে হোয়াইট হাউসে তেল শিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ব্যবসার জন্য প্রস্তুত। বক্তব্যে মনে হয়েছিল, তিনি যেন ইতিমধ্যেই ভেনিজুয়েলার তেল রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়েছেন। কিন্তু সেই বৈঠকেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানির প্রধান ভেনেজুয়েলাকে বিনিয়োগের অযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। এতে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প প্রকাশ্যেই কোম্পানিটির সমালোচনা করেন। এই টানাপোড়েন দেখিয়ে দেয়, রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকলেও বেসরকারি জ্বালানি কোম্পানিগুলো বাজার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করতে রাজি নয়।
ভূরাজনীতি, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পেলে ওপেকের প্রভাব কমতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তেল রাজনীতি ও চাপে পড়বে। চীনের ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে ইরানের তেল সরবরাহ অনিশ্চিত হলে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তেলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আবার সামনে আসতে পারে। তবে সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় উৎপাদকরা যদি উচ্চমূল্যের স্বার্থে উৎপাদন বাড়াতে অনাগ্রহী হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
![]()
লাভের চেয়ে ঝুঁকি বেশি
বিশ্লেষকদের সারকথা, ভেনেজুয়েলা ও ইরানের তেল থেকে কিছু কৌশলগত সুবিধা পাওয়া সম্ভব হলেও তার মূল্য অত্যন্ত চড়া। অতিরিক্ত তেলের সরবরাহে ভরা বাজারে নতুন করে এত বড় জ্বালানি বাজি ধরাকে অনেকেই খারাপ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। জ্বালানি আধিপত্যের স্বপ্ন তাই বাস্তবের কঠিন অঙ্কে ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















