চীনের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্প দ্রুতগতিতে দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির খাতে পরিণত হয়েছে। গবেষণা ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো, উদ্ভাবনী ওষুধের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং চুক্তির রেকর্ড বৃদ্ধির ফলে এই খাত আগামী বছরগুলোতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
খাতের আয় ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
চীনের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের আয় ২০২৪ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ ব্যাংক ইউবিএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালে দেশটির ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের বার্ষিক আয় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে, যা ২০৫০ সালে বেড়ে তিন ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছুঁতে পারে। ২০২৪ সালেই এই খাত প্রায় এক ট্রিলিয়ন চারশো বিলিয়ন ডলারের বিক্রি করেছে।

বয়স্ক জনসংখ্যা ও চিকিৎসা ব্যয়ের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধিই ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা আরও জোরদার করছে।
উদ্ভাবনী ওষুধে দ্রুত প্রবৃদ্ধি
নতুন ও উদ্ভাবনী ওষুধ, বিশেষ করে যেসব ওষুধ এখনো পূরণ না হওয়া চিকিৎসা চাহিদা লক্ষ্য করে তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আগামী বছরগুলোতে খাতের অন্য সব অংশের তুলনায় দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই ধরনের ওষুধের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকবে, যদিও পরবর্তী দশকে তা কিছুটা কমে আসতে পারে।
প্রযুক্তি শক্তি হিসেবে চীনের লক্ষ্য
বায়োটেক কোম্পানিগুলোর উদ্ভাবনী উদ্যোগ কেবল ব্যবসায়িক লাভই বাড়াচ্ছে না, বরং চীনকে একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি লক্ষ্যকেও সমর্থন দিচ্ছে। অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও মূল প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের দিকে বেইজিং জোর দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা বায়োটেক
সাংহাইভিত্তিক হেনলিয়াস বায়োটেকের মতো কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের পণ্য অনুমোদন করাতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জানান, গবেষণা, ওষুধ নিবন্ধন ও উৎপাদনের সমন্বিত ব্যবস্থার পাশাপাশি বৈশ্বিক ক্লিনিক্যাল ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ফলে তারা ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্ভাবনী ওষুধ সরবরাহ করতে পারছে।
হেনলিয়াস বর্তমানে বিশ্বের ষাটটির বেশি বাজারে দশটি ওষুধ সরবরাহ করছে, যা কোটি কোটি রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের পণ্যের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কোম্পানিগুলো দেখাচ্ছে কীভাবে চীনা বায়োটেক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মানের উদ্ভাবনী খেলোয়াড়ে পরিণত হচ্ছে।
লাইসেন্সিং চুক্তিতে রেকর্ড
২০২৫ সালে চীনা ওষুধ প্রস্তুতকারকদের লাইসেন্সিং চুক্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। হংকং ও মূল ভূখণ্ডভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈশ্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্টদের মধ্যে একের পর এক বহু বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে ওষুধের উন্নয়ন, উৎপাদন ও বিপণনের অধিকার হস্তান্তর করা হয়, যার বিনিময়ে আগাম অর্থ, মাইলফলকভিত্তিক ফি ও ভবিষ্যৎ বিক্রির রয়্যালটি পাওয়া যায়।
এই সময়ে ইনোভেন্ট বায়োলজিকস, জিনকোয়ান্টাম, থ্রি এস বায়ো এবং জিয়াংসু হেংরুই ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের বড় ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে বিশাল অঙ্কের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এসব চুক্তি ক্যানসার ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের নতুন চিকিৎসা বাজারে আনার পথ প্রশস্ত করছে।
![]()
নীতিগত সহায়তা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের উদ্ভাবনী ওষুধের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি গুণগত মান ও গবেষণার গভীরতাও উন্নত হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে উদ্ভাবনকে সহায়তা করতে একাধিক নীতি গ্রহণ করেছে, যা ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















