ঝিনাইদহে আত্মহত্যার ভয়াবহ প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে জেলাটিতে ৩০১ জন মানুষ নিজের জীবন শেষ করেছেন। এই পরিসংখ্যান সামনে এনে দিয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, সামাজিক চাপ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির গভীর বাস্তবতা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যাকারীদের বড় একটি অংশ নারী হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
আত্মহত্যার ধরন ও সংখ্যা
জেলায় আত্মহত্যার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি ছিল গলায় ফাঁস। মোট ৩০১ ঘটনার মধ্যে ১৮২ জন ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন এবং ১১৯ জন বিষপানে প্রাণ হারান। গ্রামীণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান এই তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হয়েছে।

নারী ও পুরুষের অনুপাত
২০২৫ সালে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী ছিলেন ১৬৮ জন এবং পুরুষ ১৩৩ জন। আগের বছর ২০২৪ সালে মোট আত্মহত্যা ছিল ৩১৯টি, যেখানে পুরুষ ছিলেন ১৫২ জন এবং নারী ১৬৭ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২৮ এবং ২০২২ সালে ছিল ৩২৩। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত চার বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা সামান্য কমেছে, তবে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি রয়ে গেছে।
উপজেলাভিত্তিক চিত্র
ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি, মোট ৭৯টি। এরপর রয়েছে শৈলকুপা ৬৭টি, মহেশপুর ৪৬টি, হরিণাকুন্ডা ও কালীগঞ্জে ৪৩টি করে এবং কোটচাঁদপুরে ২৩টি ঘটনা। ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী ছিলেন ১০৯ জন ও পুরুষ ৭৩ জন। বিষপানে মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারী ছিলেন ৫৭ জন এবং পুরুষ ৬২ জন।

চার বছরের সামগ্রিক পরিস্থিতি
গত চার বছরে ঝিনাইদহ জেলায় মোট ১ হাজার ২৭১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ের হিসাবেও দেখা যায়, নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাসিক প্রতিবেদনসহ একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
আত্মহত্যার পেছনের কারণ
মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নীপার মতে, নারীরা মানসিকভাবে বেশি আবেগপ্রবণ হওয়ায় আত্মহত্যার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। তিনি জানান, মাদকাসক্তি, বেকারত্ব, মানসিক রোগ, পারিবারিক কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, পরকীয়া সম্পর্ক ও দারিদ্র্য—এই সামাজিক কারণগুলো আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্বেগ
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজীর নজর উদ্দিন বলেন, জেলায় আত্মহত্যা এখন একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, মানুষ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছে এবং অনেক সময় সামান্য বিষয়েও চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতামূলক সভা হলেও আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। তবে গত বছরের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি পরিবারে শক্ত পারিবারিক বন্ধন ও ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে উঠলে আত্মহত্যার ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

প্রশাসনের অবস্থান ও গণমাধ্যমের ভূমিকা
জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ আত্মহত্যা প্রতিরোধে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আত্মহত্যার খবর এমনভাবে প্রকাশ করা উচিত, যাতে তা অন্যদের প্ররোচিত না করে। একই সঙ্গে কাউন্সেলিং সেবার বিস্তার অত্যন্ত জরুরি, কারণ সময়মতো মানসিক সহায়তা পেলে সংকটে থাকা মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও তিনি জানান এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে এসব উদ্যোগে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















