নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভেনেজুয়েলাকে অনেকেই দেখেছিলেন এক সম্ভাবনাময় পুঁজিবাদী স্বপ্নভূমি হিসেবে। জাতীয়করণ করা জ্বালানি খাত ধীরে ধীরে খুলে দেওয়া হচ্ছিল বিদেশি বিনিয়োগের জন্য। ঢুকছিল আন্তর্জাতিক পুঁজি, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক দক্ষতা। তখনকার কারাকাসে বাসা খুঁজে পাওয়াই ছিল কঠিন। বিদেশি তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা একে আখ্যা দিয়েছিলেন স্বর্ণখনির মতো সময় হিসেবে।
কিন্তু এই সমৃদ্ধির ভিত ছিল ভঙ্গুর। ১৯৯৮ সালে তেলের দাম হঠাৎ পড়ে গেলে সরকারের বাজেটে বড় ফাঁক তৈরি হয়। ব্যয় কমানো হয় ব্যাপকভাবে। এই আর্থিক চাপ থেকেই জন্ম নেয় রাজনৈতিক ক্ষোভ, যার ফল হিসেবে ক্ষমতায় আসেন বামপন্থী জনতাবাদী নেতা হুগো চাভেজ।
বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপের পর দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, বিপুল অঙ্কের মার্কিন পুঁজি ভেনেজুয়েলায় ঢুকবে এবং দেশটি আবার সফল ও নিরাপদ হয়ে উঠবে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ইতিহাস বলছে, শুধু বিদেশি অর্থ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
![]()
তেলের দাম ও শাসনের বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি সবচেয়ে ভালো চলেছে তখনই, যখন বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে উচ্চ তেলের দাম এবং জনস্বার্থে সাড়া দেওয়া সরকার একসঙ্গে কাজ করেছে। তেলের দামের ওপর সরকারের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও বৈষম্য নিয়ে জনঅসন্তোষ দূর করার রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি, যা বর্তমান মার্কিন নীতিতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
শুধু তেল শিল্প পুনর্গঠন করে ভেনেজুয়েলাকে এমন এক দেশে রূপান্তর করা সম্ভব নয়, যেখানে সমৃদ্ধি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল অধিকাংশ দেশই উত্থান-পতনের চক্রে আটকে থাকে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই দুর্বলতা আরও প্রকট।
সত্তরের দশকের তেল বুম ও তার পরিণতি
সত্তরের দশকে তেল শিল্প জাতীয়করণের সময় দেশটি যে অর্থনৈতিক উত্থান দেখেছিল, সেটিকে অনেক ভেনেজুয়েলান আজও স্মরণ করেন স্বর্ণযুগ হিসেবে। তেলের দাম তখন ছিল আকাশছোঁয়া। মুদ্রা শক্তিশালী ছিল, আমদানি ছিল সস্তা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় ভেনেজুয়েলাকে ডাকা হতো দক্ষিণ আমেরিকার সৌদি আরব।
কিন্তু এই তেল অর্থই ধীরে ধীরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ফুলিয়ে তোলে। দুর্নীতি গভীর হয়। সরকার আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তেল আয়ের ওপর। ফলে তেলের দাম কমলেই অর্থনীতি পড়ে যায় গভীর সংকটে।
নব্বইয়ের দশকে সংস্কার ও চাপা ক্ষোভ
আশির দশকের শেষ দিকে আবার তেলের দাম কমে গেলে দেশ ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়ে। পরে আবার ক্ষমতায় ফেরেন কার্লোস আন্দ্রেস পেরেজ। এবার তিনি ভর্তুকি কমান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিক্রি করেন, তেল খাত আবার বিদেশি বিনিয়োগের জন্য খুলে দেন। এতে ব্যবসা পরিবেশ কিছুটা উন্নত হয়। বিদেশি কোম্পানিগুলো বড় অঙ্কের বিনিয়োগ শুরু করে। বিলাসবহুল হোটেল, রেস্তোরাঁ আর অভিজাত জীবনযাত্রা ফিরে আসে।
কিন্তু এই উন্নতির আড়ালে জমে উঠছিল ক্ষোভ। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল। সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ছিল দুর্বল। জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার করলে দাঙ্গা হয়। সরকার বিদেশি বিনিয়োগে যতটা মনোযোগী ছিল, সাধারণ মানুষের অসন্তোষ প্রশমনে ততটাই উদাসীন ছিল।
![]()
চাভেজের উত্থান ও তেলের আশীর্বাদ
১৯৯৮ সালে আবার তেলের দাম পড়ে গেলে সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, দেশ ধনী অথচ তারা বঞ্চিত, কারণ রাজনৈতিক অভিজাতরা লুটপাট করছে। এই আবহেই চাভেজ তেলের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।
শুরুর দিকে তার শাসনে অর্থনীতি কিছুটা গতি পায়। তেলের দাম বাড়ছিল। রাষ্ট্র তেল আয়ের বড় অংশ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করে। ফলে বাজারে টাকা ছিল, ভোগব্যয় বাড়ে, ব্যবসা চাঙা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, অদক্ষতা আর কর্তৃত্ববাদী শাসন সেই সাফল্য নষ্ট করে দেয়। তেলের দাম কমতেই আবার সংকট শুরু হয়।
বর্তমান সংকট ও সন্দেহ
আজ ভেনেজুয়েলা এক দশকের বেশি সময় ধরে চরম দুর্নীতি ও মানবিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তেলের দাম এখন তুলনামূলকভাবে কম। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যৎ তেল আয় জনগণের কল্যাণে ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। স্কুল ও হাসপাতালের জন্য অর্থ ব্যয়ের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।

তবে অনেক বিশ্লেষকই সন্দিহান। তাদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো বদলানো ছাড়া শুধু বেশি তেল উত্তোলন করলে তার সুফল যাবে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর হাতে। দুর্নীতি টিকে থাকবে, দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আসবে না।
ভেনেজুয়েলার ইতিহাস তাই আবারও মনে করিয়ে দেয়, তেল আর বিদেশি অর্থ একা কোনো জাদুসমাধান নয়। স্থিতিশীলতা ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















