পাকিস্তানের পেশোয়ার শহরটি একসময় ছিল আফগান শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়। যুদ্ধ, দখলদারিত্ব আর তালেবানের দমন-পীড়ন থেকে পালিয়ে আসা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁইই পায়নি, বাঁচিয়ে রেখেছিল আফগানিস্তানের গান, সুর আর সংগীতের ঐতিহ্য। কিন্তু এখন সেই সুরই ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে পড়ছে।
পাকিস্তান সরকারের শরণার্থী প্রত্যাবাসন অভিযানের ফলে গত এক বছরে প্রায় দশ লক্ষ আফগানকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আফগান শিল্পী সমাজে, বিশেষ করে সংগীতশিল্পীদের ওপর। বিয়ের আসর, মঞ্চ কিংবা পেশোয়ারের পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে যে সুর একসময় প্রতিধ্বনিত হতো, তা এখন ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে।

আশ্রয় থেকে উৎখাতের পথে পেশোয়ার
আশির দশকে সোভিয়েত আগ্রাসন, নব্বইয়ের দশকে গৃহযুদ্ধ এবং তালেবানদের উত্থানের সময় পাকিস্তান ছিল লক্ষ লক্ষ আফগানের আশ্রয়স্থল। পেশোয়ার বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে আফগান শিল্পীদের কেন্দ্র হিসেবে। সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, কারুশিল্পী সবাই এখানে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিলেন।
তালেবান শাসনে আফগানিস্তানে সংগীত নিষিদ্ধ। বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর, শিল্পীদের নির্যাতন আর সুর ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। এই বাস্তবতায় পেশোয়ার হয়ে উঠেছিল মুক্ত সুরের শেষ আশ্রয়। কিন্তু ২০২৩ সালের পর থেকে পাকিস্তান সরকার তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ইস্যুতে অভিযোগ তোলে এবং লাখো আফগানকে অবৈধ ঘোষণা করে।
হারিয়ে যাওয়ার পথে সংগীতের ভাণ্ডার
পেশোয়ারের এক ছোট সংগীত দোকানে এখনও পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজে আফগান বিয়ের গান। দোকানের মালিক মুহাম্মদ হাসান জামরি আশির দশকে আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন। তার দোকানে আছে প্রায় দুই হাজার দুর্লভ ক্যাসেট, যার অনেকগুলো পঞ্চাশের দশকের রেকর্ডিং।

জামরি বলেন, তিনি এই ক্যাসেটগুলো আফগানিস্তানে নিতে পারেন না, কারণ তালেবান এগুলো পুড়িয়ে ফেলবে। অর্ধেক সংগ্রহ তিনি ইতিমধ্যেই লুকিয়ে রেখেছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনিশ্চয়তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি পুরো আফগান সংগীত ঐতিহ্যের প্রতীক।
পেশোয়ারে গড়ে ওঠা এক সংগীত সাম্রাজ্য
আশির দশকে প্রথম দফায় আফগান শিল্পীদের আগমন ঘটে। সেই সময় কামার গুলার মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা এখানে আশ্রয় নেন। সোভিয়েত বিরোধী গান ক্যাসেটে রেকর্ড করে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হতো, যা প্রতিরোধ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
নব্বইয়ের দশকে গৃহযুদ্ধ তীব্র হলে আরও শিল্পী পেশোয়ারে আসেন। রুবাব আর তবলার তালে গড়ে ওঠে নতুন ধারার সংগীত। হুমায়ুন সাখির মতো শিল্পীরা এখান থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছান। ছোট ফ্ল্যাটগুলো পরিণত হয় সংগীত সংস্থায়, স্টুডিওগুলোতে রেকর্ড হয় স্বর্ণযুগের তারকাদের গান।

দুই হাজার সালের শুরুর দিকে পেশোয়ারে পাঁচ শতাধিক আফগান সংগীতশিল্পী বসবাস করতেন। মাফকুরা নামের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নিয়মিত পরিবেশনা হতো। এর প্রতিষ্ঠাতা হায়াত রগানি বলেন, পেশোয়ার বহু আফগান শিল্পীকে তারকায় পরিণত করেছে।
নতুন প্রজন্মের আতঙ্ক
২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফেরার পর নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও পেশোয়ারে আশ্রয় নেন। গায়ক বায়ারালি ওয়ালি কাবুলে নিজের বাদ্যযন্ত্র লুকিয়ে রেখে সীমান্ত পাড়ি দেন। তিনি এখনও আফগানিস্তানে ফেরেননি, এমনকি মেয়ের বিয়েতেও উপস্থিত থাকতে পারেননি।
ওয়ালির আশঙ্কা, শিল্পীরা যদি ফেরত পাঠানো হয়, তবে আফগান সংগীতের সম্মিলিত আত্মাই হারিয়ে যাবে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পেশোয়ার ও আশপাশে জোরদার হয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য বলছে, ভয় আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন শিল্পীরা।

ভয় আর সুরের দ্বন্দ্ব
এক সন্ধ্যায় মাফকুরায় গাইছিলেন সাইদুল্লাহ ওয়াফা। গানের কথায় ছিল মাতৃভূমির প্রতি গভীর টান। শেষ গান শেষে বাদ্যযন্ত্র গুছিয়ে নিতে নিতে তিনি বলেন, ওপারে তালেবান আর এপারে পুলিশ, দুই দিক থেকেই একই ভয়।
পেশোয়ারের সুরগুলো এখন যেন নির্বাসনের মুখে। যদি এই শহর নীরব হয়ে যায়, তবে হারিয়ে যাবে শুধু কিছু শিল্পী নয়, হারিয়ে যাবে আফগানিস্তানের শতাব্দীপ্রাচীন সংগীত ঐতিহ্য।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















