উপসাগরীয় অঞ্চলে ভ্রমণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো। প্রস্তাবিত অভিন্ন জিসিসি পর্যটক ভিসা চালু হলে একবার আবেদন করেই সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েতে প্রবেশ করা যাবে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও আলাদা আলাদা ভিসা ব্যবস্থার কারণে যে বহুদেশীয় ভ্রমণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, এই উদ্যোগ তার বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অভিন্ন ভিসার কাঠামো ও উদ্দেশ্য
নতুন ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন করে একক স্বল্পমেয়াদি ভিসায় ছয়টি দেশে ভ্রমণের সুযোগ মিলবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিসার মেয়াদ হবে ত্রিশ দিন এবং নির্ধারিত ফি একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকবে। মূল লক্ষ্য হলো উপসাগরীয় অঞ্চলকে আলাদা আলাদা বাজার হিসেবে নয়, বরং একটি সংযুক্ত পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা। এতে পর্যটকেরা একই সফরে একাধিক দেশ ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন, যা আগে জটিল ভিসা প্রক্রিয়ার কারণে সম্ভব হতো না।
পর্যটন ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে সংযোগ
তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার কৌশলে পর্যটন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জিসিসি দেশগুলো। প্রশাসনিক বাধা কমিয়ে এই অভিন্ন ভিসা কার্যকর হলে পর্যটক সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে হোটেল, পরিবহন, বিনোদন ও খুচরা ব্যবসাসহ নানা খাতে নতুন গতি আসবে। উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদেরকে একক ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন অঞ্চল হিসেবে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করতে পারবে।
দেরিতে চালুর পেছনের কারণ
এই ভিসা চালু হতে দেরি হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক অনীহার চেয়ে বেশি কাজ করেছে নিরাপত্তা সমন্বয়ের জটিলতা। একবার যাচাইয়ের পর পুরো অঞ্চলে চলাচলের অনুমতি দিতে হলে ছয়টি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে গভীর আস্থার প্রয়োজন হয়। সেই আস্থা তৈরি হচ্ছে যৌথ তথ্যভান্ডার, বায়োমেট্রিক সমন্বয়, প্রবেশ ও প্রস্থান ব্যবস্থার সংযুক্তি এবং অভিন্ন নজরদারি তালিকার মাধ্যমে। এসব প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি ছাড়া এমন ভিসা কার্যকর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতো।

ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা পথ
অনেকে ইউরোপের অভিন্ন ভিসা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলেও উপসাগরীয় মডেলটি ভিন্নভাবে নকশা করা। এখানে অভ্যন্তরীণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে এবং এই ভিসা কাজ, বসবাস বা স্থায়ী হওয়ার কোনো অধিকার দেবে না। শ্রমবাজার বা অভিবাসন নীতির একীকরণও এর আওতায় নেই। এটি মূলত স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণ সহজ করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা, রাজনৈতিক একীকরণের প্রকল্প নয়।
নিয়ম মানা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
এই অভিন্ন ভিসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কঠোর প্রয়োগ কাঠামো। নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে সমন্বিত জরিমানা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং সব সদস্য দেশের তথ্যভান্ডারে স্বয়ংক্রিয় সতর্ক সংকেত যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এতে কোনো দেশে নিয়ম ভঙ্গ করলে অন্য দেশে গিয়ে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। যৌথ তথ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও নির্ভুল হবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা
এই উদ্যোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান আরও কৌশলগত হয়ে উঠছে। শক্তিশালী বিমান যোগাযোগ ও অবকাঠামোর কারণে অঞ্চলজুড়ে প্রবেশদ্বার হিসেবে দেশটির গুরুত্ব বাড়বে। প্রাথমিক নিরাপত্তা যাচাই ও তথ্য সংগ্রহে বড় দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে আমিরাতকে, যার জন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
একটি পরিমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি
অভিন্ন জিসিসি ভিসা কোনো সর্বাত্মক বিপ্লব নয়, তবে এটি বাস্তববাদী ও কার্যকর অগ্রগতি। প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে, পর্যটন কৌশলকে একত্রিত করে এবং নিরাপত্তার সঙ্গে চলাচলের ভারসাম্য রক্ষা করে উপসাগরীয় সহযোগিতাকে দৃশ্যমান রূপ দিচ্ছে এই উদ্যোগ। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ভ্রমণ হবে আরও সহজ, অবস্থান হবে দীর্ঘ, নিয়ম মানা হবে কঠোর এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ধীরে ধীরে একটি সংযুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্যে রূপ নেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















