দেশের পোলট্রি খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সরকার প্রস্তাবিত ‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬’। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও খামারিরা বলছেন, বাণিজ্যিক খামারের জন্য ডে-ওল্ড চিক আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রায় ষাট হাজার কোটি টাকার শিল্প হুমকির মুখে পড়তে পারে, বিপর্যস্ত হতে পারে খাদ্যনিরাপত্তা এবং সাধারণ ভোক্তার ওপর বাড়বে বাড়তি মূল্যচাপ।
নীতিমালার খসড়ায় কী বলা হয়েছে
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত তেরো জানুয়ারি খসড়া নীতিমালাটি প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারের জন্য ডে-ওল্ড চিক আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে। কেবল গ্র্যান্ডপ্যারেন্ট স্টক এবং চরম সংকটের ক্ষেত্রে সীমিতভাবে প্যারেন্ট স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারের যুক্তি ও খাতের আপত্তি
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দাবি, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোই এই নীতির মূল লক্ষ্য। তবে পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনও হয়নি। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। বড় কোনো রোগব্যাধি, যেমন বার্ড ফ্লু দেখা দিলে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন আমদানির সুযোগ না থাকলে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির মারাত্মক সংকট তৈরি হবে এবং বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে।
খাদ্যনিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য পোলট্রি সবচেয়ে সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, এই নীতি কার্যকর হলে একসঙ্গে তিন ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রান্তিক খামারি ও সাধারণ ভোক্তা। তাঁর মতে, এমন বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব অংশীজনকে নিয়ে উন্মুক্ত শুনানি হওয়া জরুরি।

প্রশাসনিক জটিলতা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পোলট্রি স্টক আমদানির প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই এখন দীর্ঘ ও জটিল। সংকটের সময়ে খসড়া নীতিতে উল্লেখ করা ‘ক্ষেত্রবিশেষে অনুমতি’ বাজার স্থিতিশীল করতে যথেষ্ট দ্রুত কাজ নাও করতে পারে। একইভাবে, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রান্তিক খামারিরা যেন ন্যায্যমূল্যে বাচ্চা পান, সেটিই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
সরকারি সক্ষমতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. বাহানুর রহমান জানান, বেসরকারি সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে বাজার সামাল দেওয়ার মতো বড় পরিসরের উৎপাদন সক্ষমতা সরকারের নিজস্বভাবে নেই। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, খসড়া নীতিমালায় বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আমদানি নিষিদ্ধ হলে দেশীয় কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান প্রভাব বিস্তার করে সিন্ডিকেট তৈরি করতে পারে, যা দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকারের অবস্থান ও সংশোধনের দাবি
সমালোচনার জবাবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, দীর্ঘমেয়াদে পোলট্রি শিল্পকে শক্তিশালী করতেই এই নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। তাঁর মতে, নীতিটি বাস্তবায়িত হলে খাত আরও সংগঠিত ও সমৃদ্ধ হবে। তবে উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা মন্ত্রণালয়ের কাছে বাস্তবসম্মত রূপান্তরকাল যুক্ত করা, বাজার নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং সরাসরি আমদানি নিষেধাজ্ঞার বদলে ধাপে ধাপে সংস্কারের আহ্বান জানাচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















