সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে দামেস্ক সরকার। একই সঙ্গে চার দিনের সময় বেঁধে দিয়ে তাদের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় একীভূত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সিরিয়া। এই প্রস্তাব মেনে নিতে কুর্দি বাহিনীকে প্রকাশ্যভাবে উৎসাহ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা কার্যত তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন শেষের পথে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি অগ্রগতি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর দ্রুত অগ্রগতি এবং কুর্দি বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে যাওয়াকে দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষমতা পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদ্রোহীদের হাতে বাশার আল আসাদের পতনের প্রায় এক বছর পর এই পরিস্থিতি তৈরি হলো। দামেস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কুর্দি বাহিনীকে অবশ্যই রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত হতে হবে, নইলে নিয়ন্ত্রণ হারানো এলাকায় সরকারি বাহিনী প্রবেশ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের দূত এক সামাজিক বার্তায় বলেন, নাগরিকত্বের অধিকার, সাংস্কৃতিক সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাসহ এই একীভূতকরণ প্রস্তাব কুর্দিদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। তাঁর ভাষায়, যে উদ্দেশ্যে কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রয়োজন এখন অনেকটাই শেষ। ফলে সিরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বজায় রাখার আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
এদিকে ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, সিরিয়ার বর্তমান নেতৃত্ব কঠোর পরিশ্রম করছে এবং তিনি তাদের সঙ্গে বন্দিশিবিরে আটক জঙ্গিদের বিষয়েও আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে কুর্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সংযম ও আলোচনার পথে থাকার আহ্বান জানান।
চার দিনের যুদ্ধবিরতি ও শর্ত
কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছে এবং আক্রমণ না হলে সামরিক পদক্ষেপ নেবে না। সিরিয়া সরকার জানায়, হাসাকা প্রদেশে একীভূতকরণ পরিকল্পনা জমা দিতে হবে কুর্দি বাহিনীকে। এই সময়ের মধ্যে তারা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে একজন সহকারী নিয়োগের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের কথাও বলেছে। চার দিনের মধ্যে অগ্রগতি না হলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংবেদনশীল বাস্তবতা
তুরস্ক ও ইরাক সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলে কুর্দি ও আরব জনগোষ্ঠীর বসবাস। এক দশক আগে এই এলাকা জঙ্গি গোষ্ঠীর দখলে চলে গেলেও পরে কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সহায়তায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। তবে এই বাহিনীর একটি অংশকে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে।
জঙ্গি বন্দি ও শিবির নিয়ে উদ্বেগ
উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় আটক থাকা বহু জঙ্গি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি এক কারাগার থেকে শতাধিক জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, যাদের বেশিরভাগকে আবার আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী একটি শিবির থেকে কুর্দি বাহিনী সরে যাওয়ায় সেখানে সরকারি বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ অচলাবস্থা ও সাম্প্রতিক সংঘাত
গত কয়েক মাস ধরে কুর্দি বাহিনীর ভবিষ্যৎ এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা নিয়ে দামেস্কের সঙ্গে অচলাবস্থা চলছিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সরকারি দাবিতে আপত্তি জানিয়ে আসছিল তারা। চলতি মাসে সেই টানাপোড়েন সংঘাতে রূপ নেয়। সম্প্রতি আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ কিছু এলাকা থেকে কুর্দি বাহিনী সরে যাওয়ার পর সরকারি বাহিনী নতুন করে অগ্রসর হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চার দিনই নির্ধারণ করে দেবে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভবিষ্যৎ। কুর্দি বাহিনী যদি একীভূতকরণের পথে যায়, তবে দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। অন্যদিকে ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















