জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আর্বানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর ঢাকা ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহরে পরিণত হওয়ার পথে। এই বিস্ময়কর নগরায়ণের মূল চালিকাশক্তি গ্রাম থেকে শহরে আসা লাখো মানুষ, যারা কাজ, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার আশায় ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, নগর বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে এই অভিবাসীদের শ্রমে। অথচ রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে নকশা করা, যেন নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী—যাদের বড় অংশই গ্রাম থেকে আসা অভিবাসী—আদৌ অস্তিত্বই রাখে না।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সুরক্ষার কথা যখন বলা হয়, তখনো শহরের ভেতরে অভিবাসীদের দৈনন্দিন জীবন যেসব ভৌগোলিক বাস্তবতায় আবদ্ধ, তা উপেক্ষিত থেকে যায়। সহজ কথায়, বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এখনো গ্রামকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পাচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, সারা দেশে চালু ১১৫টির বেশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থেকে শহরের দরিদ্র পরিবারগুলো পদ্ধতিগতভাবেই বাদ পড়ে যাচ্ছে। শহুরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু হলে তা নাকি অভিবাসনকে উৎসাহিত করবে—এই আশঙ্কাকে প্রায়ই বঞ্চনার যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, যদিও বাস্তবে ভাতার অঙ্ক শহুরে জীবনের ব্যয় মেটানোর জন্য একেবারেই অপ্রতুল। ফলে আমরা এমন এক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়েছি, যেখানে শহরের অভিবাসীরা বৈধ নগরবাসী নয়, বরং অদৃশ্য মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয়।
নগরে বঞ্চনার ব্যাপ্তি
শহুরে অভিবাসীরা কীভাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ছে, তার প্রমাণ স্পষ্ট ও নথিভুক্ত। ২০২৫ সালের জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির এক নীতিপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন শহরে বাস করলেও সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাভোগীদের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ শহরের মানুষ। শুধু শহরভিত্তিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেওয়া কর্মসূচিতে মোট সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ৪ শতাংশ বরাদ্দ থাকে। শহরের চরম দরিদ্র পরিবারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাই পায় না, যা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি বঞ্চনার হার। এমনকি বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোরও শহরে বিস্তার খুবই সীমিত; কোথাও কোথাও, যেমন বিধবা ভাতা, সিটি করপোরেশন এলাকায় কার্যকরই নয়। এর ফলে দরিদ্র নগর অভিবাসীরা কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই শহরে টিকে থাকার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই নগর-ঘাটতির বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। ২০২০ সালে সরকার ‘নগর সামাজিক সুরক্ষা কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা’ প্রণয়ন করে, যেখানে স্বীকার করা হয় যে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বস্তিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের ঝুঁকি ও বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে বলা হয়, নগর দারিদ্র্য শুধু আয়ের অভাব নয়; এর সঙ্গে জড়িত অনিরাপদ বাসস্থান, ভূমি মালিকানার অনিশ্চয়তা, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, দুর্বল সামাজিক সম্পর্ক, সহিংসতার ঝুঁকি এবং মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চনা—যা অনেক ক্ষেত্রে গ্রামীণ দারিদ্র্যের চেয়েও কঠোর। এই কর্মপরিকল্পনায় তিনটি দিক তুলে ধরা হয়: গ্রামীণ কর্মসূচি শহরে সম্প্রসারণ, নগর শ্রমবাজারভিত্তিক হস্তক্ষেপ চালু এবং নগর শ্রমিকদের জন্য সামাজিক বিমা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কিন্তু পাঁচ বছর পরও এই উদ্যোগ কার্যত স্থবির। ভাতা সম্প্রসারণ, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি, নগরভিত্তিক কর্মসংস্থান কর্মসূচি, জাতীয় সামাজিক বিমা চালু, একক নিবন্ধন ব্যবস্থা তৈরি, চলমান জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিধা বহনযোগ্য করা এবং বস্তিতে ভূমি মালিকানার অনিশ্চয়তা দূর করার মতো প্রস্তাবগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এই স্থবিরতা হয়তো আমাদের একটি সুযোগ দেয়—নগর অভিবাসীদের জন্য আরও শক্তিশালী, নিরাপত্তা ও সহনশীলতাভিত্তিক, শহরনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা পদ্ধতি নতুন করে কল্পনা করার।
নগর সামাজিক সুরক্ষার অভাব: নিরাপত্তা ও জলবায়ু ঝুঁকি
নগর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি কেবল দারিদ্র্যের প্রশ্ন নয়; এটি নিরাপত্তা ও জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গেও জড়িত। ঢাকার মতো শহরে অভিবাসীরা সাধারণত সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবণ, বন্যাপ্রবণ ও দূষিত এলাকায় বসবাস করে এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল ও অনানুষ্ঠানিক পেশায় কাজ করে। আয় সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান বা আইনি স্বীকৃতি না থাকলে জলবায়ুজনিত ধাক্কা দ্রুত বাস্তুচ্যুতি, অসুস্থতা, সংঘাত ও সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নেয়। কেবল পুলিশিং বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দিয়ে এই কাঠামোগত দুর্বলতা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই নগর সামাজিক সুরক্ষা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তার প্রথম সারির হাতিয়ার।
দৈনন্দিন জীবনের পরিসরে সামাজিক সুরক্ষা সংযুক্ত করার প্রয়োজন
বর্তমান নীতিপরামর্শগুলো এখনো সামাজিক সুরক্ষাকে কেবল তালিকা ও ভাতা বিতরণের কর্মসূচি হিসেবে দেখে। কিন্তু অভিবাসন একটি ভৌগোলিক প্রক্রিয়া, আর সুরক্ষাও সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। বিশ্বজুড়ে তুলনামূলক গবেষণা দেখায়, শহরে শুধু আয় সহায়তা যথেষ্ট নয়; সুরক্ষাকে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুযত্ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সহিংসতা প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। ঘনবসতিপূর্ণ নগর পরিবেশে সামাজিক সুরক্ষা কার্যকর হয় তখনই, যখন তা নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত থাকে।
নগরায়নের পথে থাকা বাংলাদেশ যদি সত্যিই অভিবাসীদের সুরক্ষা দিতে চায়, তবে সামাজিক সুরক্ষা শুরু হতে হবে তাদের আগমনের মুহূর্ত থেকেই—যে স্থানগুলো দিয়ে তারা বারবার শহরে প্রবেশ করে। বাস টার্মিনাল, ট্রাক স্ট্যান্ড ও পরিবহন কেন্দ্রগুলোতে অভ্যর্থনা কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। এসব কেন্দ্রে আগমন ও প্রস্থান নিবন্ধন, প্রাথমিক চিকিৎসা, পানীয় জল, ধোয়া-মোছার ব্যবস্থা এবং কাজ, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আইনি সহায়তার সঙ্গে সংযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সহজ, শাস্তিমূলক নয়—এমন কাজের অনুমতিপত্র বা টোকেন দেওয়া যেতে পারে, যাতে অনানুষ্ঠানিক কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করেই আয়ের সুযোগ নিশ্চিত হয়।

এর বাইরে, দৈনন্দিন জীবনের শর্তগুলোও নিরাপদ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ ডরমিটরি ও পানি-স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পরিবারভিত্তিক বাসস্থানের পথ, স্বাস্থ্যবিমা ও শক্তিশালী নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, এবং স্থায়ী ঠিকানার অভাবে শিশুদের বাদ না দিয়ে তাদের গ্রহণ করে এমন বিদ্যালয়। জনস্বাস্থ্যকে অধিকার হিসেবে দেখতে হবে—খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড কার্যকর করা, ন্যূনতম বায়ুমান নিশ্চিত করা এবং অভিবাসী বসতিতে পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে নিরাপত্তা ও যত্নও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা এবং খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য উন্মুক্ত স্থান তৈরি করা দরকার, যাতে কঠিন নগর জীবনে সামাজিক বন্ধন পুনর্গঠিত হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ মানুষরা অনেক সময়ই জানেন না কোন কর্মসূচি বা সহায়তা তাদের জন্য রয়েছে। তাই সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাওয়া উচিত ঠিক সেই জায়গাগুলোতেই, যেখানে তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে—শহরের টার্মিনাল, ফুটপাত, কর্মস্থল, ক্লিনিক, স্কুল, রাস্তা। অভিবাসীকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে অভিবাসীদের বাস্তব ও দৈনন্দিন জীবনের ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্য কথায়, বাংলাদেশকে তার সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নগরায়িত করতেই হবে। অভিবাসন ও জলবায়ু চাপের মধ্য দিয়ে আমাদের শহরগুলো যত বাড়বে, অভিবাসীদের সুরক্ষা ছাড়া সেগুলো নিরাপদ ও সহনশীল থাকতে পারবে না। আমরা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ব্যর্থতার মুখোমুখি, তবে তার চেয়েও গভীর সংকট হলো—নগর অভিবাসীদের জন্য দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কল্পনা করতে না পারা।
লেখক পরিচিতি
মোহাম্মদ আজাজ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক।
ইফাদুল হক পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি এবং নগর অধ্যয়ন বিষয়ে স্মিথ কলেজের সহকারী অধ্যাপক।
দায়বদ্ধতা ঘোষণা
এই লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকদের নিজস্ব।( ইউএনবি থেকে অনূদিত)
মোহাম্মদ আজাজ ও ইফাদুল হক 


















