মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল
ভেনেজুয়েলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর দেশটিতে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি গড়ে তুলতে নীরবে কাজ শুরু করেছে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা সিআইএ। ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব বিস্তারে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
সিআইএ ও পররাষ্ট্র দপ্তরের মধ্যে চলমান আলোচনায় মূলত ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে কী রূপ নেবে, তা নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। মাদুরো অপসারণের পর দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই পরিকল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।
রাষ্ট্রদূতাবাসের আগে সিআইএর ভূমিকা
সূত্রগুলো জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উপস্থিতির দায়িত্ব থাকবে পররাষ্ট্র দপ্তরের হাতে। তবে বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে পুনরায় প্রবেশের প্রাথমিক ধাপে সিআইএর ওপরই বেশি নির্ভর করতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। এক সূত্রের ভাষায়, রাষ্ট্রদপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা তোলে, কিন্তু প্রকৃত প্রভাব বিস্তার করে সিআইএ।
প্রাথমিক পর্যায়ে ভেনেজুয়েলায় পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস চালুর আগেই একটি সিআইএ সংযুক্ত কার্যালয় থেকে কাজ করতে পারেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এর মাধ্যমে তারা সরকারের বিভিন্ন গোষ্ঠী, বিরোধী নেতা এবং সম্ভাব্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন। ইউক্রেনে সিআইএর কাজের সঙ্গে এই কৌশলের মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, দূতাবাস খোলার আগেই এই সংযুক্ত কার্যালয় গড়ে তোলা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে, যা কূটনীতিকদের পক্ষে সরাসরি করা কঠিন।
নতুন নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা বার্তা
সিআইএ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও জানা গেছে, মাদুরো অপসারণের পর ভেনেজুয়েলায় সফর করা প্রথম শীর্ষ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা ছিলেন সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এই সফরে র্যাটক্লিফ নতুন নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দেন যে, ভেনেজুয়েলা আর যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে পারে না। পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত সূত্র জানায়, চীন, রাশিয়া ও ইরান সংশ্লিষ্ট হুমকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তাদের জানানোও সিআইএর দায়িত্ব হতে পারে।
এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, এই ধরনের সংবেদনশীল গোয়েন্দা ব্রিফিং পররাষ্ট্র দপ্তরের কাজ নয়। কী তথ্য গোপনীয়তা মুক্ত করে শেয়ার করা যাবে, তা জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দপ্তর নির্ধারণ করবে এবং সিআইএর কর্মকর্তারাই সেই তথ্য উপস্থাপন করবেন।

মাদুরো গ্রেপ্তারে সিআইএর ভূমিকা
সূত্র জানায়, মাদুরোকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানের কয়েক মাস আগেই ভেনেজুয়েলায় সিআইএর কর্মকর্তারা সক্রিয় ছিলেন। গত আগস্টে গোপনে একটি ছোট দল মোতায়েন করা হয়, যারা মাদুরোর চলাচল, অবস্থান ও দৈনন্দিন রুটিন পর্যবেক্ষণ করে। এই তথ্যই পরে অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এছাড়া ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরে থাকা সিআইএর এক তথ্যসূত্র মাদুরোর অবস্থান শনাক্তে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেন বলেও জানা গেছে।
রাজনৈতিক সমর্থন ও গোয়েন্দা বিশ্লেষণ
মাদুরো অপসারণের পর বিরোধী নেত্রী মারিয়া মাচাদোর পরিবর্তে ডেলসি রদ্রিগেজকে সমর্থনের সিদ্ধান্তেও সিআইএর গোপন বিশ্লেষণ প্রভাব ফেলেছিল। ওই বিশ্লেষণে মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হলে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারকদের অনুরোধে তৈরি করা হয় এবং ভবিষ্যতেও ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব পরিস্থিতি নিয়ে সিআইএ এমন পরামর্শ দিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের অস্পষ্ট লক্ষ্য
মাদুরো গ্রেপ্তারের পর এখন ভেনেজুয়েলার ভেতর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারে মনোযোগ দিচ্ছে সিআইএ। একই সঙ্গে তারা নতুন নেতৃত্বের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করছে। তবে পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউস এখনো ভেনেজুয়েলা নিয়ে তাদের সামগ্রিক লক্ষ্য স্পষ্ট করেনি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মাদুরোকে ধরার পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটি ‘চালাবে’। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দূতাবাস পুনরায় চালুর প্রস্তুতি
২০১৯ সালে কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস কার্যক্রম স্থগিত করে কূটনীতিকদের প্রত্যাহার করা হয়। এরপর কলম্বিয়ার বোগোতায় অবস্থিত দূতাবাস থেকে ভেনেজুয়েলা বিষয়ক ইউনিট পরিচালিত হচ্ছিল।
গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র দপ্তর অভিজ্ঞ কূটনীতিক লরা ডোগুকে ভেনেজুয়েলা বিষয়ক ইউনিটের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এই পরিবর্তনকালীন সময়ে পূর্ণকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান অত্যন্ত জরুরি এবং ডোগু এ জন্য উপযুক্ত।
জানুয়ারির শুরুতে মাদুরো অপসারণের পরপরই কারাকাসে দূতাবাস ভবনের অবস্থা ও নিরাপত্তা যাচাই করতে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মীদের একটি দল পাঠানো হয়। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক মার্কিন কূটনৈতিক ও কারিগরি কর্মী সেখানে প্রাথমিক মূল্যায়ন চালাচ্ছেন।
![]()
নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা ও জনমতের প্রশ্ন
ভেনেজুয়েলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। সাধারণত পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন, যা সিআইএর প্রাথমিক ভূমিকা বড় হওয়ার একটি কারণ। রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় এই নিরাপত্তা ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
মাদুরোর শাসনামলে সিআইএকে বহুবার শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল এবং প্রমাণ ছাড়াই অভ্যুত্থানের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এখন সেই সিআইএই মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। ফলে মাদুরো-পরবর্তী সময়ে ভেনেজুয়েলার জনগণ যুক্তরাষ্ট্র ও সিআইএর এই দৃশ্যমান উপস্থিতিকে কীভাবে গ্রহণ করবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















