যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে আছড়ে পড়া ভয়াবহ শীত ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবন। তীব্র তুষারপাত, বরফ বৃষ্টি ও হিমশীতল বাতাসে অন্তত সতের জনের প্রাণহানি হয়েছে। জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে অন্তত বিশটি অঙ্গরাজ্য ও রাজধানী ওয়াশিংটনে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরা আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচলে।
উপসাগর–আমেরিকা আকাশপথে চরম বিপর্যয়
শীত ঝড়ের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলাচলকারী একাধিক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে। দুবাইভিত্তিক এমিরেটস জানিয়েছে, নিউইয়র্ক গামী নির্ধারিত দুটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আজকের ফ্লাইটগুলো পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে পরিচালনার আশা করা হচ্ছে।
আবুধাবি ভিত্তিক ইতিহাদ এয়ারওয়েজ জানায়, নিউইয়র্ক গামী একটি ফ্লাইট বিলম্বে পরিচালিত হলেও আবহাওয়া অনিশ্চিত থাকায় আরও বিলম্ব বা বাতিলের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এর আগে নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ও দীর্ঘ বিলম্ব দেখা গেছে। একই সময়ে নিউইয়র্ক ও নিউয়ার্ক রুটে সব ফ্লাইট বাতিল করে এয়ার ইন্ডিয়া।
বিমানবন্দর বন্ধ, পুনরুদ্ধার ধীরগতির
ঝড়টি মধ্য আটলান্টিক অঞ্চল অতিক্রম করায় ধীরে ধীরে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে। ওয়াশিংটন ডালাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর জানিয়েছে, আবহাওয়ার উন্নতির সঙ্গে ধাপে ধাপে ফ্লাইট চালু করা হবে। তবে বিমান বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিমান অবস্থান পরিবর্তন, ক্রুদের কাজের সীমা ও বড় কেন্দ্রগুলোর জটের কারণে বিমানবন্দর খুললে ও বিলম্ব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। যাত্রীদের নিয়মিত ফ্লাইটের অবস্থা যাচাই এবং পুনরায় বুকিংয়ের জন্য অতিরিক্ত সময় হাতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কানাডা পর্যন্ত বিস্তৃত ঝড়, টরন্টোতে রেকর্ড তুষার

শীতঝড়টি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চল পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব কানাডায় ছড়িয়ে পড়ে। কানাডার টরন্টোর কিছু এলাকায় রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া ও বোস্টনের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো বরফে ঢেকে যায়। ওয়াশিংটনে সকাল শুরু হয় পুরু তুষারের চাদরে, পরে বরফ বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। আগাম সতর্কতা হিসেবে ফেডারেল দপ্তরগুলো বন্ধ রাখা হয়।
বিদ্যুৎহীন লাখো মানুষ, দক্ষিণাঞ্চলে ঝুঁকি বেশি
ঝড়ের তীব্রতায় বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে আট লাখ চল্লিশ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় পড়েন। টেনেসিতে তিন লাখের বেশি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অন্ধকারে ডুবে যায়। লুইজিয়ানা, মিসিসিপি ও জর্জিয়ায় ও ব্যাপক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়, যা সেখানে তুলনামূলক বিরল হওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
প্রাণহানি ও প্রশাসনের সতর্কতা

নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি জানান, সপ্তাহান্তে প্রবল শীতে বাইরে পাঁচজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। টেক্সাসে স্লেজ দুর্ঘটনায় এক কিশোরীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। লুইজিয়ানায় হাইপোথার্মিয়ায় দুজনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। টেক্সাস থেকে নর্থ ক্যারোলাইনা ও নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়াতে নাগরিকদের ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
তীব্র ঠান্ডা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা
জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, ঝড়ের পর আর্কটিক অঞ্চলের ঠান্ডা বায়ু প্রবাহিত হয়ে আগামী কয়েক দিন অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা বজায় থাকতে পারে। উত্তরাঞ্চলীয় সমভূমি ও আপার মিডওয়েস্টে বাতাসের সঙ্গে অনুভূত তাপমাত্রা মাইনাস পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রির নিচে নামতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি এবং চলাচল কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জলবায়ু বিতর্কের নতুন মাত্রা
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মেরু অঞ্চলে ঠান্ডা বায়ু চক্রের অস্বাভাবিক বিস্তারের ফলেই এমন চরম শীত ঝড় দেখা দিচ্ছে, যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে। যদিও এ নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে ও আবহাওয়া দপ্তর নাগরিকদের নিরাপদে থাকার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















