ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি, ভিসা কার্যক্রম স্থগিত এবং দূত প্রত্যাহারের মতো ঘটনাগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে ভারতের আদানি পাওয়ার। দুই দেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই বিদ্যুৎ বাণিজ্য এখন বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
বিদ্যুৎ রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন
ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গোড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ রপ্তানি গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২৫ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টায়। এই প্রবৃদ্ধির ফলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যে ভারতের অংশ বেড়ে রেকর্ড ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১২ শতাংশ। ২০২৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে আদানি।
![]()
কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও বিদ্যুৎ বাণিজ্য
নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে কেন্দ্র করে দুই দেশই ভিসা সেবা স্থগিত করেছে এবং একে অপরের দূতদের তলব করেছে। তবু এই কূটনৈতিক শীতলতার প্রভাব বিদ্যুৎ বাণিজ্যে পড়েনি। বরং বিদ্যুৎ সরবরাহ ও আমদানি আগের তুলনায় আরও বেড়েছে।
গ্যাস সংকটে আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানিয়েছেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় এবং ২০২৬ সালে বিদ্যুতের চাহিদা ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কায় বিদ্যুৎ আমদানি এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। গ্যাসই বাংলাদেশের প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানি হলেও স্থানীয় উৎপাদন দ্রুত কমে যাওয়া এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সংকট তীব্র হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ চলতি বছরে কয়লা আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যায়। বিশ্লেষণ সংস্থা ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের কয়লা আমদানি ৩৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১ কোটি ৭৩ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।

জ্বালানি মিশ্রণে পরিবর্তন
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামোয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশ নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪২ দশমিক ৬ শতাংশে। অথচ আগের এক দশক ধরে মোট উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসত গ্যাস থেকে।
এই শূন্যস্থান পূরণে বড় ভূমিকা রাখছে আদানি। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে রেকর্ড ৮৬৩ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে, যা মোট সরবরাহের ৮ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য কোম্পানি থেকে বিদ্যুৎ আমদানি তুলনামূলকভাবে সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৯ কোটি ২০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টায়। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ২৭ দিনেই বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ এসেছে আদানির কাছ থেকে।
![]()
ব্যয় তুলনা ও বাস্তবতা
ঢাকাভিত্তিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেনের মতে, আদানির বিদ্যুৎ এখনো তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে সস্তা। গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির সংকটে বাংলাদেশকে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল। এই বাস্তবতায় আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক চাপ সামলানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে ভারত-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বাণিজ্য আরও গভীর হচ্ছে, আর সেই প্রবণতার কেন্দ্রে রয়েছে আদানি পাওয়ার।
Sarakhon Report 






















