০৪:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
জব্দ ট্যাংকার ফেরত দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে নতুন সমীকরণ ভোটের পোস্টার নিষিদ্ধ: ছাপাখানাকে কড়া নির্দেশ নির্বাচন কমিশনের ভারতের টেস্ট ইতিহাসের বিস্মৃত নায়কদের খোঁজে দুবাইয়ের দুই বন্ধু সান্তনার জয়ে কিউইদের প্রত্যাবর্তন, সাইফার্ট–স্যান্টনারে ভারতের বিপক্ষে বড় ব্যবধান অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে সিনারের দাপট, সেমিফাইনালে জকোভিচ এর সঙ্গে মহারণ সংস্কৃতি আর স্মৃতির স্বাদে নতুন যাত্রা, মধ্যপ্রাচ্যে অনন্য খাবারের অভিজ্ঞতা আনলেন আশা ভোঁসলে দুবাইয়ের আকাশছোঁয়া উচ্চতায় জেসন মোমোয়া: সিনেমা, জীবন আর শান্ত থাকার দর্শন দুবাই ব্র্যান্ডেড আবাসনের বিশ্বরাজধানী, বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নতুন উচ্চতা মার্কিন সামরিক হুমকির মধ্যেই আলোচনায় অনড় ইরান, আরব দেশগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা এশিয়াজুড়ে বিমানবন্দরে কড়াকড়ি নজরদারি, ভারতে নিপা শনাক্ত হতেই সতর্কতা

পাহাড়ের বুকেই তালাবদ্ধ ঘর, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার গল্প

রাস আল খাইমার দুর্গম পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা ওয়াদি শাম এক সময় ছিল কঠিন অথচ গভীর মানবিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। চারপাশজুড়ে পাহাড়, সীমিত সম্পদ আর প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা—এই বাস্তবতাতেই গড়ে উঠেছিল এক অনন্য সমাজব্যবস্থা। আজ থেকে প্রায় আট দশক আগে এখানকার মানুষের জীবন ছিল সহজ, কিন্তু প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের।

পাহাড়ঘেরা জীবনের শুরু

ওয়াদি শামে পাহাড় শুধু দৃশ্যপট নয়, জীবনধারার অংশ। এই পাহাড়ই নির্ধারণ করত কোথায় বসতি হবে, কীভাবে ঘর বানানো হবে, কীভাবে পানি আর খাদ্য জোগাড় করা হবে। এলাকার বাসিন্দা সাঈদ আবদুল্লাহ আলধুহুরি স্মৃতিচারণায় জানান, ছোটবেলায় ভেড়ার পাল ছিল পরিবারের মূল ভরসা, আর প্রতিটি ফোঁটা পানি ছিল অমূল্য।

Khaleej - Look: How RAK families lived in Wadi Shaam's 'houses of locks' 80  years ago ⛰️  Hidden deep within the rugged mountains of Ras Al Khaimah, Wadi  Shaam reveals a

তালাবদ্ধ ঘর, বহুমুখী ব্যবহার

ওয়াদি শামের ঐতিহ্যবাহী ঘরগুলো পরিচিত ছিল ‘বাইত আল ক্বোফল’ নামে, অর্থাৎ তালাবদ্ধ ঘর। পাথর, পাহাড়ি কাঁকর, কাঠ আর কাদামাটি দিয়ে তৈরি এসব ঘর ছিল একই সঙ্গে রান্নাঘর, শোবার জায়গা ও খাদ্য সংরক্ষণের স্থান। দেয়াল ছিল পুরু, ছাদে ব্যবহার করা হতো পাহাড়ি উদ্ভিদ, যাতে কাদা গলে না যায়। শীতে এসব ঘর তুলনামূলক আরামদায়ক হলেও গ্রীষ্মে তাপ সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ত।

ছোট গ্রাম, স্বনির্ভর জীবন

আহবাবাত এলাকার মতো ছোট গ্রামে ছিল মাত্র দশটি ঘর। এখানকার মানুষ গম ফলাত, ভেড়া পালত এবং পুরোপুরি জমি ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে জীবন চালাত। আল ঘাশবাহ গ্রামের কিছু ঘর ছিল চল্লিশের দশকেরও আগের। প্রতিটি গ্রাম ছিল নিজস্ব নিয়ম আর ঐতিহ্যে গড়া।

Khaleej - Look: How RAK families lived in Wadi Shaam's 'houses of locks' 80  years ago ⛰️  Hidden deep within the rugged mountains of Ras Al Khaimah, Wadi  Shaam reveals a

ঋতুভিত্তিক যাত্রা ও দীর্ঘ পথচলা

গ্রীষ্ম এলেই পরিবারগুলো পাহাড়ের তুলনামূলক শীতল এলাকায় সরে যেত। কেউ যেত গাছপালা আর পানির উৎসের কাছে, কেউ আবার আরও দূরে। অনেক পরিবার পায়ে হেঁটে পাঁচ থেকে সাত দিনের যাত্রায় ফুজাইরার দিকে রওনা হতো। গাধা আর উটে করে নেওয়া হতো রান্নার সরঞ্জাম, চিনি, খেজুর। পথে নির্দিষ্ট স্থানে রাত কাটিয়ে আবার ফসল আর শুকনো মাছ নিয়ে ঘরে ফেরা ছিল নিয়মিত ঘটনা।

পানির জন্য বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা

আধুনিক নির্মাণসামগ্রী আসার আগে পাহাড়ি মানুষ পানির জন্য ব্যবহার করত বিশেষ ধরনের কাদামাটি। এই কাদামাটি দিয়ে তৈরি হতো জলাধার, যেখানে বৃষ্টির পানি জমা থাকত। ছোট খাল দিয়ে পানি এসে জমত এসব পুকুরে, আগে থেকেই ছেঁকে নেওয়া হতো ময়লা। এই ব্যবস্থাই পাহাড়ে বসবাসকারীদের পান করা, রান্না আর গোসলের পানির চাহিদা মেটাত।

Khaleej - Look: How RAK families lived in Wadi Shaam's 'houses of locks' 80  years ago ⛰️  Hidden deep within the rugged mountains of Ras Al Khaimah, Wadi  Shaam reveals a

খাদ্য, মধু আর সামাজিক বন্ধন

ওয়াদি শামের জীবন ঘুরপাক খেত খোলা মাঠ, ভেড়ার পাল আর মৌচাককে ঘিরে। প্রতিটি গ্রাম বিশেষ ধরনের মধুর জন্য পরিচিত ছিল। পাথরের চুলায় বানানো রুটি, নিজস্ব পনির আর মধুই ছিল দৈনন্দিন খাদ্য। সত্তরের দশকের শুরুতে ভালো বৃষ্টি আর সবুজে ভরে উঠেছিল পাহাড়, ফসলও ছিল প্রচুর।

পরিবর্তনের সূচনা

সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠনের পর পাহাড়ি জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মানুষকে পাহাড় ছেড়ে পরিকল্পিত আবাসনে যেতে উৎসাহ দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ, পানি আর নিরাপদ ঘর জীবনের মান বদলে দেয়। তবে পাহাড়ে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধন আর ঐতিহ্য আজও মানুষের স্মৃতিতে অটুট।

ওয়াদি শামের গল্প যেন এক খোলা জানালা, যেখানে দেখা যায় প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রেখে কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার এক মানবিক ইতিহাস।

জনপ্রিয় সংবাদ

জব্দ ট্যাংকার ফেরত দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে নতুন সমীকরণ

পাহাড়ের বুকেই তালাবদ্ধ ঘর, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার গল্প

০৩:০৪:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

রাস আল খাইমার দুর্গম পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা ওয়াদি শাম এক সময় ছিল কঠিন অথচ গভীর মানবিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। চারপাশজুড়ে পাহাড়, সীমিত সম্পদ আর প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা—এই বাস্তবতাতেই গড়ে উঠেছিল এক অনন্য সমাজব্যবস্থা। আজ থেকে প্রায় আট দশক আগে এখানকার মানুষের জীবন ছিল সহজ, কিন্তু প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের।

পাহাড়ঘেরা জীবনের শুরু

ওয়াদি শামে পাহাড় শুধু দৃশ্যপট নয়, জীবনধারার অংশ। এই পাহাড়ই নির্ধারণ করত কোথায় বসতি হবে, কীভাবে ঘর বানানো হবে, কীভাবে পানি আর খাদ্য জোগাড় করা হবে। এলাকার বাসিন্দা সাঈদ আবদুল্লাহ আলধুহুরি স্মৃতিচারণায় জানান, ছোটবেলায় ভেড়ার পাল ছিল পরিবারের মূল ভরসা, আর প্রতিটি ফোঁটা পানি ছিল অমূল্য।

Khaleej - Look: How RAK families lived in Wadi Shaam's 'houses of locks' 80  years ago ⛰️  Hidden deep within the rugged mountains of Ras Al Khaimah, Wadi  Shaam reveals a

তালাবদ্ধ ঘর, বহুমুখী ব্যবহার

ওয়াদি শামের ঐতিহ্যবাহী ঘরগুলো পরিচিত ছিল ‘বাইত আল ক্বোফল’ নামে, অর্থাৎ তালাবদ্ধ ঘর। পাথর, পাহাড়ি কাঁকর, কাঠ আর কাদামাটি দিয়ে তৈরি এসব ঘর ছিল একই সঙ্গে রান্নাঘর, শোবার জায়গা ও খাদ্য সংরক্ষণের স্থান। দেয়াল ছিল পুরু, ছাদে ব্যবহার করা হতো পাহাড়ি উদ্ভিদ, যাতে কাদা গলে না যায়। শীতে এসব ঘর তুলনামূলক আরামদায়ক হলেও গ্রীষ্মে তাপ সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ত।

ছোট গ্রাম, স্বনির্ভর জীবন

আহবাবাত এলাকার মতো ছোট গ্রামে ছিল মাত্র দশটি ঘর। এখানকার মানুষ গম ফলাত, ভেড়া পালত এবং পুরোপুরি জমি ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে জীবন চালাত। আল ঘাশবাহ গ্রামের কিছু ঘর ছিল চল্লিশের দশকেরও আগের। প্রতিটি গ্রাম ছিল নিজস্ব নিয়ম আর ঐতিহ্যে গড়া।

Khaleej - Look: How RAK families lived in Wadi Shaam's 'houses of locks' 80  years ago ⛰️  Hidden deep within the rugged mountains of Ras Al Khaimah, Wadi  Shaam reveals a

ঋতুভিত্তিক যাত্রা ও দীর্ঘ পথচলা

গ্রীষ্ম এলেই পরিবারগুলো পাহাড়ের তুলনামূলক শীতল এলাকায় সরে যেত। কেউ যেত গাছপালা আর পানির উৎসের কাছে, কেউ আবার আরও দূরে। অনেক পরিবার পায়ে হেঁটে পাঁচ থেকে সাত দিনের যাত্রায় ফুজাইরার দিকে রওনা হতো। গাধা আর উটে করে নেওয়া হতো রান্নার সরঞ্জাম, চিনি, খেজুর। পথে নির্দিষ্ট স্থানে রাত কাটিয়ে আবার ফসল আর শুকনো মাছ নিয়ে ঘরে ফেরা ছিল নিয়মিত ঘটনা।

পানির জন্য বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা

আধুনিক নির্মাণসামগ্রী আসার আগে পাহাড়ি মানুষ পানির জন্য ব্যবহার করত বিশেষ ধরনের কাদামাটি। এই কাদামাটি দিয়ে তৈরি হতো জলাধার, যেখানে বৃষ্টির পানি জমা থাকত। ছোট খাল দিয়ে পানি এসে জমত এসব পুকুরে, আগে থেকেই ছেঁকে নেওয়া হতো ময়লা। এই ব্যবস্থাই পাহাড়ে বসবাসকারীদের পান করা, রান্না আর গোসলের পানির চাহিদা মেটাত।

Khaleej - Look: How RAK families lived in Wadi Shaam's 'houses of locks' 80  years ago ⛰️  Hidden deep within the rugged mountains of Ras Al Khaimah, Wadi  Shaam reveals a

খাদ্য, মধু আর সামাজিক বন্ধন

ওয়াদি শামের জীবন ঘুরপাক খেত খোলা মাঠ, ভেড়ার পাল আর মৌচাককে ঘিরে। প্রতিটি গ্রাম বিশেষ ধরনের মধুর জন্য পরিচিত ছিল। পাথরের চুলায় বানানো রুটি, নিজস্ব পনির আর মধুই ছিল দৈনন্দিন খাদ্য। সত্তরের দশকের শুরুতে ভালো বৃষ্টি আর সবুজে ভরে উঠেছিল পাহাড়, ফসলও ছিল প্রচুর।

পরিবর্তনের সূচনা

সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠনের পর পাহাড়ি জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মানুষকে পাহাড় ছেড়ে পরিকল্পিত আবাসনে যেতে উৎসাহ দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ, পানি আর নিরাপদ ঘর জীবনের মান বদলে দেয়। তবে পাহাড়ে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধন আর ঐতিহ্য আজও মানুষের স্মৃতিতে অটুট।

ওয়াদি শামের গল্প যেন এক খোলা জানালা, যেখানে দেখা যায় প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রেখে কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার এক মানবিক ইতিহাস।