ওসাকার মানুষ খাবার নিয়ে কথা বলে দীর্ঘদিন ধরে। কোন রেস্তোরাঁয় কী খাওয়া হয়েছিল, কী স্বাদ ছিল, সেটি কতটা মনে রয়ে গেছে—এসব আলোচনা এখানে স্বাভাবিক বিষয়। জাপানের এই শহর নিজেকে গর্বের সঙ্গে ‘দেশের রান্নাঘর’ বলে পরিচয় দেয়। সেই শহরেই এক্সপো শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বারবার উঠে আসছে একটি নাম—ইউএই প্যাভিলিয়নের আমিরাতি রেস্তোরাঁ।
নীরবে ছড়িয়ে পড়া এক স্মৃতি
কোনো জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা নয়, বরং ক্যাফের আড্ডা, অনলাইন মন্তব্য আর হালকা কথোপকথনে এই রেস্তোরাঁর কথা ঘুরে ফিরে এসেছে। অনেকেই আলোচনা শুরু করেছেন সহজ এক প্রশ্ন দিয়ে—এক্সপোতে সেই জায়গাটায় খেয়েছিলে কি। ওসাকার মতো শহরে এভাবে কোনো রেস্তোরাঁর কথা মনে রাখা সহজ নয়, আর সেখানেই এই অভিজ্ঞতা আলাদা হয়ে উঠেছে।

প্রথম পরিচয়, অচেনা কিন্তু স্বস্তির
বেশির ভাগ জাপানি দর্শকের জন্য এটি ছিল আমিরাতি খাবারের প্রথম স্বাদ। আগাম কোনো ধারণা ছিল না, কী খেতে যাচ্ছেন তা নিয়েও প্রত্যাশা স্পষ্ট ছিল না। কেউ লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভিড় দেখে, কেউ অনলাইনে ছবি দেখে আগ্রহী হয়েছেন, আবার কেউ কৌতূহল নিয়েই ঢুকেছেন, যদিও খানিকটা দ্বিধা ছিল।
খাবারের পরিবেশন সেই দ্বিধা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। বেন্টো বাক্সের পরিচিত কাঠামো জাপানি দর্শকদের কাছে স্বস্তির মনে হয়েছে। এক নজরেই পুরো খাবার দেখা যায়, সবকিছু গোছানো, পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ। নতুন স্বাদ হলেও তা চাপ সৃষ্টি করেনি, বরং ধীরে ধীরে পরিচয়ের সুযোগ দিয়েছে।
প্রধান খাবারে ধীর, গভীর বিস্ময়
বেন্টোর ভেতরের খাবারই অনেককে চমকে দেয়। ধীরে রান্না করা সুগন্ধি ভেড়ার ওউজি দ্রুতই প্রিয় তালিকায় উঠে আসে। মুরগির মাচবুস ঝাঁঝালো না হয়ে আরামদায়ক উষ্ণতা দিয়েছে। মাছের সালুনা ও ভাতের সংযোজন অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ লেগেছে। নিরামিষ পদেও হতাশা ছিল না। গ্রিল করা বেগুন, সবজি মাচবুস ভাত আর ডাগুস বারবার অর্ডার পেয়েছে।
সালাদ ও ডেজার্টে সূক্ষ্ম চমক
সালাদ নীরব হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ডালিম দেওয়া হারিস সালাদে এসেছে টাটকা অনুভূতি। খেজুর, পনির ও শাকের মিশ্রণে তৈরি জারজির সালাদে মিষ্টি আর ঝাঁঝালো স্বাদের সংযোগ অনেক জাপানি অতিথিকে বিস্মিত করেছে, বিশেষ করে নোনতা খাবারে খেজুরের ব্যবহার।
মিষ্টান্নে এসে অনেকেই একটু থমকে গেছেন। খেজুরের সিরাপ দেওয়া লুকাইমাত সহজেই আপন মনে হয়েছে। কিন্তু বাতিথা আর আসিদা ছিল আরও সূক্ষ্ম। প্রথমে স্পষ্ট অনুভূতি না জাগালেও পরে অনেকেই বলেছেন, সেই স্বাদ বারবার মনে পড়েছে।
আতিথেয়তার অনুভূতি
সব মিলিয়ে খাবার আর পুরো অভিজ্ঞতা শুধু স্বাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনেক পরে কেউ কেউ একে আলতো করে ‘আমিরাতি আতিথেয়তা’ বলে বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে উটের দুধ আলাদা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কেউ কৌতূহল থেকে, কেউ আগেই শুনে সেটি খুঁজে নিয়েছেন। সবচেয়ে বড় চমক ছিল, খুব দ্রুতই সেটি অচেনা মনে হওয়া বন্ধ করে দেয়। কেউ কেউ একই দিনে আবারও অর্ডার করেছেন।

ভিড়, প্রত্যাবর্তন আর আস্থা
রেস্তোরাঁর সামনে লাইন ছিল নিয়মিত দৃশ্য। সময়ের সঙ্গে বোঝা গেছে, কারা ফিরে আসছেন। তাদের ভঙ্গি ছিল বেশি নিশ্চিন্ত, অর্ডার দেওয়ার সময় দ্বিধা ছিল না। এক্সপোর মাঝপথে রেস্তোরাঁ আগেভাগে খুলতে শুরু করে, যা ওসাকার দৃষ্টিতে চাহিদার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ধরা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, অনেকে শুধু খাবার খেতেই আবার এসেছেন। নতুন প্যাভিলিয়ন দেখার জন্য নয়, তালিকা পূরণের জন্যও নয়। কেবল আবার সেই খাবারের জন্য। ওসাকার মতো খাদ্যসচেতন শহরে এই পুনরাবৃত্তিই সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
সংখ্যার পেছনের গল্প
এক্সপো শেষে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ছয় মাসে প্রায় এক লাখ আশি হাজার অতিথি এই রেস্তোরাঁয় খেয়েছেন। পরিবেশন করা হয়েছে দুই লাখ আটান্ন হাজারের বেশি খাবার ও পানীয়। তৈরি হয়েছে সাতান্ন হাজারের বেশি বেন্টো বাক্স। উটের দুধ পরিবেশন করা হয়েছে চৌষট্টি হাজার বারেরও বেশি। তবে মানুষ সংখ্যাকে মনে রাখে না। তারা মনে রাখে প্রথম কামড়, আবার লাইনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত, আর অচেনা খাবারের স্বস্তি।
শেষের কথায় নীরব প্রশংসা
এক্সপো শেষ হয়ে গেলেও ওসাকায় আমিরাতি রেস্তোরাঁর নাম এখনও আলোচনায় আসে। জোরে নয়, স্মৃতিচারণার ভঙ্গিতে নয়, বরং স্বাভাবিকভাবেই। আর এই শহরে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশংসা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















