ভারত থেকে নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশের অপসারিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তাঁর দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করার পর এই মন্তব্য দেশটির আগামী মাসের গুরুত্বপূর্ণ ভোটকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে।
২০২৪ সালে শিক্ষার্থী আন্দোলন দমনে কঠোর অভিযানের জন্য শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং তাঁর ১৫ বছরের শাসনের অবসান হয়। ওই ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে পাঠানো এক ইমেইলে শেখ হাসিনা সতর্ক করে বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মুখে পড়বে।

তিনি অভিযোগ করেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাঁর দল সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দিয়ে তাঁর সমর্থকদের লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।
তিনি লেখেন, জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে বারবার রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করলে ক্ষোভ বাড়ে, প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা ক্ষুণ্ন হয় এবং ভবিষ্যতের অস্থিরতার ক্ষেত্র তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্জনের মাধ্যমে গঠিত কোনো সরকার বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।

উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচন
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার অংশ নিতে পারবেন। এই নির্বাচনকে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নেতৃত্বে থাকা মুহাম্মদ ইউনূস এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করছেন। ভোটারদের সামনে একটি প্রস্তাবিত সাংবিধানিক গণভোটও রয়েছে, যেখানে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি বিবেচিত হবে। গত সপ্তাহে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে।
সহিংস অস্থিরতার কয়েক সপ্তাহ পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর ইউনূস দেশে ফিরে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পর নির্বাচন কতটা গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রস্তাবিত গণভোটকে ঘিরে অনিশ্চয়তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে, কারণ এটি সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
ইউনূসের দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী সুশৃঙ্খল নির্বাচন নিশ্চিত করবে এবং জোরজবরদস্তি বা সহিংসতার মাধ্যমে ফল প্রভাবিত করতে কাউকে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকেও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কমনওয়েলথসহ প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন।
আগামীর অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ
শেখ হাসিনার অপসারণের পর থেকে বাংলাদেশ নানা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে। আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যদিও সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সমালোচকেরা ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইউনূসের অধীনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে। একাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে এবং দেশের শীর্ষ দুই দৈনিক পত্রিকার কার্যালয়ে বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীরা হামলা চালিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে। দলের নেতা তারেক রহমান, বয়স ৬০, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এবং গত মাসে তিনি মারা যান। তারেক রহমান ১৭ বছরেরও বেশি সময় স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার পর গত ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। তিনি ১৭ কোটি মানুষের এই দক্ষিণ এশীয় দেশটির স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১টি দলের একটি জোট।
শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী তীব্র চাপে ছিল এবং নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ ছিল। দলের শীর্ষ নেতাদের অনেককে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বা কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে। তারা ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও পরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে।
দেশের ‘ক্ষত সারাতে হবে’ বলে দাবি শেখ হাসিনার
দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচকেরা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার অভিযোগ করে আসছেন। ভিন্নমত দমন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিপীড়নের অভিযোগও ছিল তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগও উঠেছে।
তবে শিক্ষার্থী আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অনুপস্থিতিতে তাঁকে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সে আদালতকে তিনি ‘প্রহসনের আদালত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ওই বিচারের ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এপি-কে পাঠানো ইমেইলে শেখ হাসিনা বলেন, এগিয়ে যেতে হলে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বর্জনের চক্র ভাঙতে হবে। তিনি দাবি করেন, তাঁর শাসনামলে কিছু নির্বাচন পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক ছিল না, কারণ বড় রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বর্জন করেছিল।

তিনি স্বীকার করেন, বিষয়টি আদর্শ ছিল না এবং বলেন, এখন রাজনৈতিক দলগুলোর এই চক্র শেষ করতে হবে, নইলে মুক্তির কোনো পথ থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রয়োজন জনগণের প্রকৃত সম্মতিতে গঠিত একটি বৈধ সরকার।
তার ভাষায়, সেটিই হবে দেশের ক্ষত সারানোর সর্বোত্তম উপায়।
নয়াদিল্লি থেকে প্রতিবেদন করেছেন শেখ সালীক।
জুলহাস আলম, শেখ সালীক 
























