বিশ্বের আর্থিক শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত ডলার নিয়ে শক্তির প্রদর্শন পছন্দ করা ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর অবস্থান বরাবরই কৌতূহল জাগায়। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেছিলেন, ডলার ভালোই চলছে। কিন্তু সেই বক্তব্যের পর পরই মুদ্রাটি প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার ঝুড়ির বিপরীতে প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। ক্ষমতা গ্রহণের আগের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এখন পর্যন্ত ডলারের দর কমেছে প্রায় বারো শতাংশ।
ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থমন্ত্রী শক্তিশালী ডলার নীতির কথা বললেও বাস্তবে ট্রাম্পের ধারণা, দুর্বল ডলার হলে রপ্তানি বাড়বে, আমদানি কমবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি সঙ্কুচিত হবে। বিনিয়োগকারীদের একাংশের উদ্বেগ এখানেই থেমে নেই। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে চাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতির ক্ষয়—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যতিক্রমী অবস্থান ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন জোরালো হয়েছে। বাজারে এ প্রবণতাকে বলা হচ্ছে অবমূল্যায়নের পথে বাজি ধরা।
সোনার উত্থান, ডলারের চাপ
এই ভাবনার প্রথম প্রমাণ হিসেবে উঠে আসছে সোনার দাম। এক আউন্স সোনার মূল্য ছাড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার ডলার , যা বছরের শুরু থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বৈশ্বিক শুল্ক নীতির ঘোষণা আসার পর বড় মার্কিন শেয়ার সূচক পতনে গেলে বহু দিনে সোনার দাম উল্টো বেড়েছে। এমনকি শেয়ারবাজার উত্থানেও সোনা শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার এই আচরণ বাজারের উদ্বেগকে স্পষ্ট করছে।
তবু কেন শক্ত মার্কিন সম্পদ
তবে শুধু সোনার দিকে তাকালে পুরো ছবি ধরা পড়ে না। ডলার দুর্বল হলেও মার্কিন শেয়ারবাজার শক্ত। গত এক বছরে বড় সূচক উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং নতুন সর্বোচ্চ পৌঁছেছে। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদও ট্রাম্পের দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের তুলনায় কম। অর্থাৎ ডলার নড়বড়ে হলেও মার্কিন সম্পদ থেকে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফেরাচ্ছেন না।

ডলার কি সত্যিই দুর্বল
এখানে একটি ব্যাখ্যা হলো, ডলার বাস্তবে অতটা দুর্বল নয়। মূল্যস্ফীতির পার্থক্য হিসাব করলে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় ডলার এখনও অনেকটাই শক্ত। আন্তর্জাতিক তুলনায় বহু মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান বেশি। অর্থাৎ সাম্প্রতিক পতন হলেও ঐতিহাসিক বিচারে ডলার এখনো শক্ত অবস্থানেই আছে।
ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগকারীদের কৌশল
আরেকটি ব্যাখ্যা আসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা থেকে। বিশ্ব আর্থিক সংকটের পর থেকে তারা ব্যাপকভাবে মার্কিন সম্পদে বিনিয়োগ করেছে। পরে মুদ্রা ঝুঁকি কমাতে বৈদেশিক মুদ্রা অদলবদলের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বিনিময় হার আগেভাগে নিশ্চিত করার প্রবণতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সংগঠন আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংক-এর গবেষণা বলছে, শুল্কঘোষণার ধাক্কায় বাজার নামার পর অনেক বিনিয়োগকারী হঠাৎ করেই এই সুরক্ষায় ঝুঁকেছেন। ফলে ডলারের দুর্বলতা অনেক ক্ষেত্রে বিক্রি নয়, বরং ঝুঁকি ঢেকে নেওয়ার ফল।
সামনে কী হতে পারে
এই দুই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয়, ডলারের আরও নামার জায়গা আছে। যদি স্বল্পমেয়াদি সুদ কমানো হয়, তবে মুদ্রা অদলবদলের খরচ কমবে এবং আরও বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় এগোবেন। এতে ডলারের ওপর চাপ বাড়তে পারে। এই চক্র দীর্ঘ হলে ঝুঁকি ঢাকার প্রবণতা ধীরে ধীরে সম্পদ বিক্রির দিকেও যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হলে সেই সময় খুব দূরে নাও থাকতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















