দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় দাগ প্রতিরোধী কার্পেট তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীভাবে পানীয় জল ও পরিবেশ দূষিত করেছে—পাঁচটি সংবাদমাধ্যমের যৌথ অনুসন্ধানে সেই চিত্র উঠে এসেছে।
জর্জিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কারখানাগুলোতে ১৯৭০-এর দশক থেকে কার্পেটে এসব রাসায়নিক ব্যবহার শুরু হয়। উৎপাদন প্রক্রিয়ার বর্জ্যজলের মাধ্যমে সেগুলো নদীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পানীয় জলে মিশে যায়।
বিজ্ঞানীরা এসব বর্ণহীন ও গন্ধহীন যৌগকে পিএফএএস নামে চিহ্নিত করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ভেঙে না যাওয়ায় এগুলোকে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়। এখন এই রাসায়নিক পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে—মানুষের শরীরেও, যেখানে তা রক্তে ঘুরে বেড়ায় এবং কিছু অঙ্গে জমা হয়।
মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়তে থাকলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা স্থানীয় পানি সরবরাহ সংস্থার সঙ্গে ব্যক্তিগত সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজেদের ওপর নজরদারি এড়াতে সক্ষম হন। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ক্যান্সার ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার মতো ঝুঁকির প্রমাণ জোরালো হওয়ার পরও ২০০০ ও ২০১০-এর দশক পর্যন্ত কার্পেট প্রস্তুতকারকেরা এসব রাসায়নিক ব্যবহার চালিয়ে যায়।
তবে বড় কার্পেট কোম্পানিগুলোর দাবি, তারা সব নিয়ম মেনে চলেছে এবং এখন পিএফএএস ব্যবহার বন্ধ করেছে। তাদের বক্তব্য, সরবরাহকারীরা আগের রাসায়নিকগুলো নিরাপদ বলে ভুল তথ্য দিয়েছিল।
সাক্ষাৎকার ও আদালতের নথির ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য বলছে, উত্তর-পশ্চিম জর্জিয়ার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে জনস্বাস্থ্য উপেক্ষিত হয়েছে। একই সঙ্গে দূষণের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আলাবামা ও সাউথ ক্যারোলিনার অংশেও।
কার্পেটের বিশ্ব রাজধানী

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে কার্পেট উৎপাদনের কেন্দ্র উত্তর-পশ্চিম জর্জিয়া। বিশাল কারখানা, ট্রাকের বহর এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শিল্পে কর্মসংস্থান—সব মিলিয়ে এটি স্থানীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু এখানকার অনেক বাসিন্দাই এখন চিরস্থায়ী রাসায়নিকজনিত স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগছেন। সাবেক কারখানা শ্রমিক মেরি জ্যাকসনের রক্তে পিএফএএস পাওয়া গেছে এবং তার থাইরয়েডে গাঁট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এখানকার মানুষ কাজ জানে, কাজ করে এবং বাড়ি ফিরে—এটাই তাদের জীবন।
তদন্তে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কার্পেট কোম্পানি ও রাসায়নিক সরবরাহকারীরা আইনগতভাবে বিভিন্ন ধরনের পিএফএএস ব্যবহার বদলাতে পেরেছে। বৃহত্তম দুই কোম্পানির কারখানা দূষিত বর্জ্যজল এমন শোধন ব্যবস্থায় পাঠাত, যা এই রাসায়নিক অপসারণ করতে পারত না। ফলে দূষিত জল নদীতে পৌঁছায়।
দুই কোম্পানিই জানায়, তারা ২০১৯ সালে পিএফএএস ব্যবহার বন্ধ করেছে এবং স্থানীয় পানি সংস্থার অনুমতি মেনে পরিচালিত হয়েছে। সংস্থাটির বক্তব্য, তারা ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশনা অনুসরণ করে, যারা শিল্প বর্জ্যে পিএফএএস নিষিদ্ধ করেনি।
সমস্যা শনাক্ত, সমাধানের উদ্যোগ
সাউথ ক্যারোলিনায় অনুসন্ধানের মাধ্যমে নদীতে পিএফএএস দূষণ ধরা পড়ে। এর ফলে মামলা দায়ের হয় এবং পরে দূষণ কমানোর সম্ভাব্য সমাধান সামনে আসে।
একটি কারখানার কাছের নদীতে দূষণের উৎস শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানি আদালতে লড়াইয়ের বদলে বিশেষ কার্বনভিত্তিক ফিল্টার বসানোর প্রস্তাব দেয়, যা কারখানা থেকে বের হওয়ার আগেই পিএফএএস আটকে দেবে। এতে মামলাকারী পক্ষ মামলা প্রত্যাহার করে।
ঘটনাটি দেখায়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ধীরগতির হলেও একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যার সমাধানে সম্ভাব্য পথও খুঁজে পেতে পারে।
ব্যক্তিগত কূপের পানিতে বাড়তি ঝুঁকি
প্রায় চার কোটি আমেরিকান ব্যক্তিগত কূপের পানির ওপর নির্ভরশীল। সেখানে পিএফএএস দূষণ হলে ঝুঁকি আরও বেশি।
সরকারি পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতে ফেডারেল সীমা মানতে হলেও ব্যক্তিগত কূপের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। অনেক সময় কূপের মালিকেরা সবার শেষে দূষণের খবর জানতে পারেন, আর নতুন নিরাপদ পানির উৎস পেতে বছর লেগে যায়।
আলাবামায় পানীয় জলের সংকট
জর্জিয়ার কার্পেট কারখানা এলাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে আলাবামার কয়েকটি শহর সীমিত সহায়তায় পানীয় জলের পিএফএএস দূষণ মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে।
পরিষ্কার পানির দাবিতে বাসিন্দাদের লড়াইয়ের মধ্যে কয়েকটি ছোট শহর উজানের কার্পেট কোম্পানি ও রাসায়নিক উৎপাদকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যাতে ব্যয়বহুল পানি শোধনাগার নির্মাণের অর্থ পাওয়া যায়। একটি শহরে সমঝোতার অর্থে নতুন রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট নির্মাণ চলছে, যা ২০২৭ সালে চালু হওয়ার কথা। ততদিন বাসিন্দাদের উদ্বেগ রয়ে গেছে।
পিএফএএস নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
বিভিন্ন ভোক্তা পণ্যে পিএফএএস ব্যবহৃত হলেও কার্পেট শিল্পে এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। অতি সামান্য পরিমাণও পানীয় জলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
এই রাসায়নিক ননস্টিক রান্নার পাত্র, রেইনকোট, অগ্নিনির্বাপক ফোমসহ বহু পণ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। কীভাবে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করে, কী ঝুঁকি তৈরি করে এবং কীভাবে এড়ানো যায়—এসব বিষয়েও অনুসন্ধান চালানো হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি একাধিক সংবাদমাধ্যমের যৌথ অনুসন্ধানের অংশ, যেখানে কার্পেট শিল্পের দূষণ উত্তরাধিকার নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















