চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মইনুল ইসলাম মাদ্রাসা দীর্ঘদিন ধরেই হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রায় নয় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এই প্রতিষ্ঠানকে অনেকে সংগঠনটির শক্তিকেন্দ্র বলেও উল্লেখ করেন। ছুটির সময় হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাস ছিল সরব। মাদ্রাসা মসজিদের পেছনে পাশাপাশি শায়িত আছেন হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফী ও পরবর্তী আমির জুনায়েদ বাবুনগরী, যা সংগঠনটির ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে নতুন বিতর্ক
সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের বর্তমান আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর জামায়াতবিরোধী ধারাবাহিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব মন্তব্য সংগঠনের ভেতরে মতপার্থক্যও তৈরি করেছে। হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে শুরু করে নির্বাচনী মাঠ পর্যন্ত এই বিভক্তির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

অরাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে রাজনৈতিক প্রভাব
হেফাজতে ইসলাম নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিলেও বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বড় একটি ভোটভিত্তি থাকায় বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি সংগঠনটির সমর্থন পেতে আগ্রহী। তবে সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে হেফাজত আমির প্রকাশ্যে জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম ও নাজায়েজ বলে ঘোষণা করেন এবং একই সঙ্গে বিএনপির প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দেন। সংগঠনের একাংশ এটিকে আকিদাগত অবস্থান হিসেবে দেখলেও অন্য অংশ একে ব্যক্তিগত মতামত বলে মনে করছে।
জোট রাজনীতি ও বিভক্ত ভোটভিত্তি
হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক জোটে অবস্থান করছে। মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস ও নেজামী ইসলামী পার্টি রয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে, অন্যদিকে জমিয়তে উলমায়ে ইসলাম বাংলাদেশ রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে। নেতৃত্বের এই বিভাজন হেফাজতের ভোটভিত্তিতেও প্রভাব ফেলেছে। ফলে সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের কেউ বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে, আবার কেউ জামায়াত জোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

নেতাদের ভিন্নমত
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী বলেন, কারও ক্ষমতায় আসা বা সরে যাওয়া নিশ্চিত করা সংগঠনের কাজ নয়। আমিরের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট তিনিই ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবেন। অন্যদিকে যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী আমিরের অবস্থানকে সমর্থন করে বলেন, আকিদাগত কারণেই জামায়াত থেকে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং তাদের রাজনীতি এখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। তিনি দাবি করেন, আল্লাহর আইনের প্রশ্নে আপস না করাই হেফাজতের মূল অবস্থান।
জুলাই-পরবর্তী পরিস্থিতি
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র করার চেষ্টা শুরু করলে জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে থাকে হেফাজত। এরপর থেকেই সংগঠনটির আমিরের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক সমালোচনা সামনে আসে।

ভোটভিত্তির ভৌগোলিক বিস্তার
চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক উল্লেখযোগ্য ভোটসমর্থন রয়েছে হেফাজতে ইসলামের। বিশেষ করে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও পটিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় এই প্রভাব বেশি দৃশ্যমান।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক ও ফটিকছড়ি আসনের প্রার্থী নুরুল আমিন বলেন, হেফাজত আমিরের সমালোচনার কারণ বা যৌক্তিকতা সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। বিষয়টি জনগণের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















