অনেক মানুষ তার পাশে ছিল, এমনকি তিনি জেলে যাওয়ার পরও।
সাম্প্রতিক বিচার বিভাগীয় নথি প্রকাশের পর আবারও স্পষ্ট হয়েছে, জেফ্রি এপস্টিন সম্ভবত এই শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে সফল সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের একজন হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবেন। তিনি প্রায় সবাইকে চিনতেন—নাম ব্যবহার, সুবিধা বিনিময়, যৌন পাচার এবং সম্ভবত ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ওপরে উঠেছিলেন।
মনে হয় কেবল ভ্লাদিমির পুতিনই তার শয়তানি আকর্ষণের বাইরে ছিলেন।
যাদের তার ঘনিষ্ঠ পরিচিত হিসেবে সামনে আনা হয়েছে, তাদের অনেকেই আগে দাবি করেছিলেন তারা তাকে প্রায় চিনতেনই না। এখন তারা সবাই বলছেন, শিশুকামিতার বিষয়টি দেখার মতো ঘনিষ্ঠতা তাদের ছিল না। তবু তার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তারা অপমানিত, অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় যৌন অপরাধে জেলে যাওয়ার পরও অনেকেই তার পাশে ছিলেন, এমনকি ২০১৯ সালে আবার যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পরও। সে সময় ভুক্তভোগীদের দুর্দশা যেন পরে মনে পড়ত। সম্ভবত কারণ, অতীতে তার কাছ থেকে তারা যা পেয়েছিলেন—ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ, প্রভাবশালী মানুষের কাছে পৌঁছানো, তরুণীদের সান্নিধ্য এবং অবিরাম সুবিধা—সেগুলো এখনও পাওয়ার আশাই ছিল। এপস্টিন নথির প্রকৃতি এটাই: এটি দেখায়, বৈশ্বিক সুবিধাপ্রাপ্ত, সফল ও আত্মগর্বী এক শ্রেণির মানুষ কী ধরনের উপহার পেতে চাইত।
কখনও তা ছিল প্রাডা ব্যাগ। কখনও এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ, কিংবা তার দ্বীপে সপ্তাহান্ত। কখনও কোনো দাতব্য সংস্থা বা স্কুলে অনুদান। আবার কারও সন্তানের জন্য উডি অ্যালেনের চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ, অথবা অ্যালেনের নিজের সন্তানের জন্য দ্রুত ভর্তি সুবিধা। কখনও “লম্বা, সুইডিশ স্বর্ণকেশী” নারী। আবার কখনও এমন তরুণী, যে বয়সের ব্যবধান দেখে “কিছুটা অস্বস্তিতে” থাকতে পারে।

আগের ইমেইলসম্ভার নিয়ে লিখতে গিয়ে আনন্দ গিরিধরদাস প্রশ্ন তুলেছিলেন: এপস্টিন কীভাবে এত অচেনা মানুষকে কাছে টানলেন? ইমেইলগুলো দেখায়, গোপন তথ্যের এক ধরনের বিনিময় অর্থনীতি ছিল বড় আকর্ষণ। এটি এমন এক জগৎ নয়, যেখানে নৈশভোজে আপনি কেবল এক বোতল ওয়াইন নিয়ে যান।
গোপন তথ্যই একমাত্র সম্পদ ছিল না তার হাতে। নতুন নথিগুলো দেখায়, এক ধরনের অতিসেবাদাতা পরিচারকের ভূমিকায় থেকে তিনি কীভাবে অনুগ্রহ ও বন্ধুত্ব জয় করতেন। কখনও অতিথি আনতে হেলিকপ্টার পাঠানোর প্রস্তাব—২০১২ সালের এক ইমেইলে ইলন মাস্ককে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, দ্বীপে যেতে হেলিকপ্টারে কতজন থাকবেন। অন্য এক সময় মাস্কই জানতে চেয়েছিলেন, কোনো পার্টির পরিকল্পনা আছে কি না।
এপস্টিন দিয়েছেন ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ, ইন্টার্নশিপ, অ্যাপল ঘড়ি, হারমেস ব্যাগ, বড় আকারের জিপারযুক্ত সোয়েটশার্ট, প্রায় দশ হাজার ডলারের অন্তর্বাস ও টি-শার্ট, এমনকি অতিবৃহৎ কাশ্মীরি সোয়েটার। আর আছেন লেখক মাইকেল উলফ, যিনি তাকে লিখেছিলেন—জুতাগুলো খুব সুন্দর, ধন্যবাদ।
এপস্টিন নথিতে নিজেকে হাস্যকর ও ভীতিকরভাবে উপস্থাপনের নানা উদাহরণ আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপগুলোর একটি ২০১৬ সালে লেখা এক ইমেইল, যেখানে বলা হয়েছিল—নারীর দেহ নাকি কম কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ, তবে গ্লুটেনের ফলাফল এখনও অপেক্ষায়। সতেরো বছর বয়সী ভির্জিনিয়া জিউফ্রেকে জড়িয়ে থাকা সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর ছবি সবাই দেখেছেন। বিল ক্লিনটনের গরম পানির টবে থাকা ছবিও রয়েছে।
আরও কিছু আপাত নিরীহ ইমেইল আছে, যা সমানভাবে উদ্বেগজনক। কারণ এগুলো এমন এক জগতের ছবি দেয়, যেখানে নিবন্ধিত যৌন অপরাধীর দ্বীপে সন্তানদের নিয়ে যাওয়াও স্বাভাবিক মনে করা হয়। ২০১২ সালে বাণিজ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর একটি বার্তায় বলা হয়েছিল, তারা সকালে আসবেন এবং সঙ্গে থাকবে সাত থেকে ষোল বছর বয়সী আট শিশু। পরে সেই মন্ত্রী এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করে বলেছিলেন, ২০০৫ সালেই তিনি এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে আর যোগাযোগ রাখেননি। কিন্তু ২০১৭ সালে তার সম্মানে একটি অজানা সংস্থায় পঞ্চাশ হাজার ডলার অনুদান দেওয়া হয়।
অনেক ইমেইল এমন এক সামাজিক বাস্তবতা দেখায়, যেখানে মর্যাদা বাড়িয়ে তোলার লেনদেন চলে। হলিউডের পরিচিতজনদের ব্যবহার করে তিনি ধনী কিন্তু গ্ল্যামারবিহীন বন্ধুদের আকৃষ্ট করতেন। ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণের সুযোগ—বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন কারও জন্য—দূর পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে।
২০১৬ সালে নিউইয়র্কের এক প্রভাবশালী আইন প্রতিষ্ঠানের প্রধান তার ছেলের জন্য ব্যক্তিগত অনুরোধ জানিয়েছিলেন—সে যেন অ্যালেনের নতুন চলচ্চিত্রে কোনোভাবে কাজের সুযোগ পায়, পারিশ্রমিকের দরকার নেই। সন্তানের জন্য চাকরি চাওয়া বেআইনি নয়। কিন্তু লক্ষণীয়, সেই আইন প্রতিষ্ঠানই পরে এমন এক প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা করেছিল, যার নামও এপস্টিন নথিতে অসংখ্যবার এসেছে—ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প এ বিষয়ে কী করেছিলেন? তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ঠিক এমন স্বার্থান্বেষী বৈশ্বিক অভিজাতদের প্রভাব থেকে আমেরিকাকে মুক্ত করবেন। ২০১৬ সালের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ব্যবস্থাকে তার চেয়ে ভালো কেউ চেনে না, তাই তিনিই একে ঠিক করতে পারবেন।
এই বার্তা মানুষের মনে সাড়া ফেলেছিল। সে সময় অনেকেই বিশ্বাস করেছিল, যত পরিশ্রম বা মেধাই থাকুক, এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়—দোষ অভিজাতদের। একই সময়ে উঠে আসে এক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, যেখানে দাবি করা হয়েছিল, প্রভাবশালীরা নাকি যৌন পাচারচক্র চালাচ্ছে।
তত্ত্বটি তখন যেমন অবাস্তব মনে হয়েছিল, এখনও তেমনই। কিন্তু এপস্টিন নথি দেখায়, বাস্তবের সঙ্গে কিছু অস্বস্তিকর সাদৃশ্য ছিল।
এই নথিগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু ভয়াবহ গোপন সত্য—সাধারণতা ও বিভীষিকা, তৃষ্ণা ও অপরাধ একসঙ্গে মিশে গেছে। এটাই হয়তো সবচেয়ে বিচলিত করার বিষয়।
দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও এপস্টিন সমাজচ্যুত হননি, যতক্ষণ না তিনি কিছু দেওয়ার মতো অবস্থানে ছিলেন। নিয়মের ঊর্ধ্বে ভাবা মানুষদের কাছে তার লেনদেনভিত্তিক নৈতিকতাহীনতা বরং আকর্ষণই বাড়িয়েছিল।
মলি জং-ফাস্ট 



















