ঝুঁকি যখন বারবার সামনে আসে, তখন সম্ভাব্য বিপর্যয় আর কল্পনা থাকে না—বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে অনলাইন চ্যালেঞ্জগুলো বেপরোয়া মনে হলেও কিশোরদের কাছে সেগুলো আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে। কেন ক্ষণিকের কৌতূহল বিপজ্জনক আচরণে রূপ নেয় এবং কেন ঝুঁকির চেয়ে উত্তেজনাই বড় হয়ে দাঁড়ায়—এই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের বিষয়।
বিপজ্জনক ভাইরাল প্রবণতার বিস্তার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছড়িয়ে পড়েছে। কখনও ঠান্ডার ওষুধে মুরগি রান্না করার মতো বিপজ্জনক প্রবণতা, কখনও চোখ বেঁধে বিপজ্জনক পথে হাঁটা, আবার কখনও শ্বাসরোধ করে অচেতন হওয়ার মতো প্রাণঘাতী খেলা—এসবের প্রত্যেকটিই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। কিছু চ্যালেঞ্জ আত্মক্ষতির আশঙ্কা পর্যন্ত তৈরি করায় বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গবেষণা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার ব্যাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও অনলাইনে ভয়, গুজব ও বাস্তব দুর্বলতার মিশ্রণ যে মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তা স্পষ্ট হয়েছে।
কেন শিশু ও কিশোররা বেশি ঝুঁকিপ্রবণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের মস্তিষ্ক পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয় প্রায় বিশ বছর বয়সে। সিদ্ধান্ত নেওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফল বোঝার সঙ্গে জড়িত অংশটি সবচেয়ে পরে পরিপক্ব হয়। ফলে এই সময়ে যুক্তির চেয়ে আবেগ ও সামাজিক প্রভাব বেশি কাজ করে। হতাশা, উদ্বেগ, মানসিক আঘাত বা আত্মমর্যাদাবোধের ঘাটতি থাকলে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া অনেকের কাছে মানসিক যন্ত্রণার প্রকাশ বা পালানোর পথ হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে অনলাইন নির্ভরতা, তুলনা করার প্রবণতা এবং গ্রহণযোগ্যতার চাপ কিশোরদের মধ্যে একাকিত্ব ও ভঙ্গুরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের ক্ষেত্র তৈরি করছে।
স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা কেন নিরাপত্তাকে ছাপিয়ে যায়
যেসব শিশু নিজেকে একা বা অবহেলিত মনে করে, তারা অনলাইনে গ্রহণযোগ্যতা খোঁজে। কম আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কিশোরদের কাছে কোনো চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া নিজেকে দৃশ্যমান করার উপায় বলে মনে হতে পারে। হতাশা গভীর হলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার গুরুত্ব কমে যায়।
সহপাঠীদের চাপও বড় ভূমিকা রাখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই চাপকে প্রকাশ্য ও অবিরাম করে তোলে। কোনো চ্যালেঞ্জ থেকে সরে দাঁড়ানো প্রকাশ্য ব্যর্থতা মনে হতে পারে, আর অংশ নেওয়া তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি এনে দেয়। ধীরে ধীরে কৌতূহল স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয় এবং কাজগুলো ক্রমেই বিপজ্জনক দিকে এগোয়।
অভিভাবকদের জন্য সতর্ক সংকেত
ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ হঠাৎ শুরু হয় না; আগে দেখা যায় আচরণ, মেজাজ ও অনলাইন ব্যবহারে সূক্ষ্ম পরিবর্তন। মোবাইল ব্যবহার নিয়ে অতিরিক্ত গোপনীয়তা, হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা, অনলাইনে স্বীকৃতির প্রতি আসক্তি, পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া, বিপজ্জনক সাহসিকতার কথা বলা, নতুন প্রভাবশালী অনলাইন বন্ধুত্ব, অজানা আঘাত বা শারীরিক অসুস্থতা, নিজেকে মূল্যহীন মনে করা কিংবা পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া—এসবই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
অ্যালগরিদমের প্রভাব ও অনলাইন বাস্তবতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম অনিশ্চিত পুরস্কারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের বারবার একই আচরণে উৎসাহিত করে। লাইক, মন্তব্য ও ভিউ ডোপামিনের মতো কাজ করে, যা কিশোরদের জন্য প্রায় অপরিহার্য মনে হতে পারে। ফলে যুক্তিসঙ্গত সতর্কবার্তা অনেক সময় কাজ করে না; বরং ভয়ভিত্তিক শাসন গোপনীয়তা বাড়ায়।
আসল সুরক্ষা কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও খোলামেলা যোগাযোগ। যেসব কিশোর আবেগগতভাবে সমর্থন পায়, আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে ওঠে এবং অফলাইনে ইতিবাচক ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ থাকে, তারা বিপজ্জনক অনলাইন আচরণে কম জড়ায়।
বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ শিশুদের আত্মক্ষতির ইচ্ছা থেকে নয়; বরং বিকাশমান মস্তিষ্ক, মানসিক দুর্বলতা ও সামাজিক স্বীকৃতির শক্তিশালী ব্যবস্থার মিলিত প্রভাবে ছড়ায়। তাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আশ্বাস—তারা যথেষ্ট মূল্যবান।
অভিভাবকদের করণীয়
শুরু থেকেই সন্তানদের সঙ্গে অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বাভাবিক আলোচনা করা জরুরি। শাস্তির ভয় নয়, নিরাপদ আশ্রয় হওয়া দরকার পরিবারকে। অনলাইন চাপের প্রকৃতি বোঝানো, আচরণগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা, রাতে শোবার ঘরে ডিভাইস না রাখা, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মানসিক কষ্টের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নেওয়া—এসব পদক্ষেপই কার্যকর সুরক্ষা গড়ে তুলতে পারে।
Sarakhon Report 


















