গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই প্রতিষ্ঠিত কৌশল ভেঙে দেন, যখন তিনি রাশিয়ার সঙ্গে শেষ বড় পারমাণবিক চুক্তিটি নবায়ন করেননি। ‘নিউ স্টার্ট’ নামে পরিচিত ওই চুক্তি ২০১১ সালে কার্যকর হয়েছিল এবং উভয় পক্ষকে বোমারু বিমান, সাবমেরিন ও আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রে মোতায়েনকৃত কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা ১ হাজার ৫৫০-এ সীমাবদ্ধ রাখত। বৃহস্পতিবার চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, বিশ্বের প্রয়োজন “নতুন, উন্নত ও আধুনিকায়িত একটি চুক্তি, যা দীর্ঘ ভবিষ্যৎ পর্যন্ত টিকে থাকবে।”
শুক্রবার তাঁর প্রশাসন এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তুলে ধরে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি থমাস ডি ন্যানো জানান, যুক্তরাষ্ট্র এবার বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একটি বিস্তৃত বহুপাক্ষিক চুক্তির আলোচনা শুরু করার চেষ্টা করবে। জেনেভায় জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে তিনি বলেন, পরবর্তী যুগের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারে এবং উচিতও, তবে এতে শুধু রাশিয়া নয়—আরও দেশকে আলোচনার টেবিলে আনতে হবে। তিনি সতর্ক করেন, এই প্রক্রিয়া দ্রুত বা সহজ হবে—এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া যায় না।
এই মন্তব্য বাস্তবতার তুলনায় অনেক কম বলেই মনে হয়। পরিকল্পনাটি সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আর সর্বনিম্ন ক্ষেত্রে অসৎ। ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বগ্রাসী পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাবের ওপরিভাগে আকর্ষণ রয়েছে। কেন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াই পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত করার চুক্তিতে আবদ্ধ থাকবে? বিশ্বের সব অস্ত্রভাণ্ডার সীমিত করা এবং সব পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে পারস্পরিক জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা কি করা উচিত নয়?
অন্য পারমাণবিক রাষ্ট্রগুলোকে অস্ত্রভাণ্ডারের আকার ও নতুন অস্ত্রের ধরন সীমিত করার চুক্তিতে আনার চেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু এটি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র—সবাই স্বীকৃত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, অথচ তারা খুব কম বিষয়েই একমত হয় এবং তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের আকারও ব্যাপকভাবে ভিন্ন। আরও চারটি দেশ—ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়া—পারমাণবিক অস্ত্র রাখলেও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়; তাদের আমন্ত্রণ পাওয়ার সম্ভাবনাও কম।
ডি ন্যানো নির্দিষ্ট করে বলেননি কোন দেশগুলোকে আলোচনায় আনা হবে, তবে চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছা প্রশাসন লুকায়নি। কিন্তু চীনসহ অন্যান্য পারমাণবিক শক্তি তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সীমিত করতে আগ্রহ খুব কমই দেখিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বেইজিং “এই পর্যায়ে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় অংশ নেবে না।”

চীনের এই স্পষ্ট অনীহাই দেখায় যে বৃহৎ কৌশলগত এই উদ্যোগ আসলে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকেই দুর্বল করার এক ধরনের কৌশল হতে পারে। প্রেসিডেন্ট বারবার বলেছেন তিনি বিশ্বে কম পারমাণবিক অস্ত্র চান, কিন্তু তিনি একাধিক পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেছেন, নিরস্ত্রীকরণ সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের সরিয়েছেন এবং নিয়মিতভাবে বিশ্বের সামনে নিজের বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
ধরা যাক কূটনৈতিক অগ্রগতি ঘটল, তবুও দ্রুত কার্যকর নতুন চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। ‘নিউ স্টার্ট’ চূড়ান্ত করতে এক বছর লেগেছিল, আর সেটিও ছিল বহু দশকের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল। একটি দেশের সঙ্গে দরকষাকষিই কঠিন; সেখানে আরও একটি দেশ যুক্ত হলে জটিলতা ও সময় বহুগুণ বাড়বে।
বাইডেন প্রশাসনে পারমাণবিক বিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন আলেকজান্দ্রা বেল। তাঁর মতে, চীনকে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় আনা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলেও ট্রাম্পের সব-নয়তো-কিছুই-নয় পন্থা উল্টো ফল দেবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে অর্ধশতাব্দীর স্থিতিশীলতা তৈরির প্রচেষ্টা ত্যাগ করে অস্পষ্ট ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আশায় থাকা নির্বুদ্ধিতার কাছাকাছি এক ধরনের বেপরোয়া সিদ্ধান্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আনুমানিক ৩ হাজার ৭০০ এবং রাশিয়ার কাছে ৪ হাজার ৩০০ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যেখানে চীনের সংখ্যা প্রায় ৬০০। বেইজিং সম্ভবত সমতা অর্জনের অবস্থান থেকে আলোচনায় বসতে চায় এবং সে লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। পেন্টাগনের ধারণা, দশকের শেষে চীন তার ওয়ারহেড সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে এক হাজারের বেশি করবে—যা বর্তমানে অন্য কোনো দেশের তুলনায় দ্রুততম বৃদ্ধি। আলোচনার জন্য যথেষ্ট অস্ত্র আছে কি না—চীন তা নিয়ে ভাবলেও তার ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা ইতিমধ্যেই দুই দেশের ভারসাম্যভিত্তিক পারমাণবিক যুগকে বদলে দিয়েছে।
জেনেভায় বক্তব্যে ডি ন্যানো চীনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালে গোপন পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর অভিযোগ তোলেন, যা সব ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধকারী আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন হতে পারে। যদিও তিনি কোনো প্রমাণ দেননি কিংবা কেন এই অভিযোগ প্রকাশ পেতে প্রায় ছয় বছর লাগল তা ব্যাখ্যা করেননি; এটি বেইজিংকে আলোচনায় আনতে চাপ সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে।
ওবামা প্রশাসনে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন থমাস এম. কান্ট্রিম্যান। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও চীন সম্পর্কে নিজের অভিযোগ তুলে ধরেছে—এটি প্রক্রিয়ার বৈধ অংশ। এখন প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি ব্যক্তিগতভাবে রাশিয়ার সঙ্গে বাস্তবসম্মত আলোচনার প্রস্তাব এবং চীনের সঙ্গে সংলাপ এগিয়ে নেবে—যা অধিকাংশ আমেরিকানই সমর্থন করে? নাকি ট্রাম্পপন্থী প্রভাবশালী মহলের চাপে সরাসরি আরও ওয়ারহেড মোতায়েনের পথে যাবে?
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের এই আলোচনার পটভূমিতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র যোগ করার রাজনৈতিক গতি তৈরি হয়েছে। এর একটি কারণ প্রতিক্রিয়া—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া মহাকাশভিত্তিক ও অতিধ্বনিত প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে, যা ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তি তৈরির সময় কল্পনাও করা হয়নি। এই অর্থে ট্রাম্পের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ “আধুনিকায়ন” করার ইচ্ছা আংশিকভাবে যৌক্তিক। কিন্তু কোনো বিদ্যমান কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে নয়—এখন শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতায় ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থিতিশীল অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র কেন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে রাশিয়াকেই কেন্দ্র করেছে—তার কারণ দুটি দেশ মিলেই বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পারমাণবিক ওয়ারহেড ধারণ করে। অস্ত্রের সংখ্যা সীমিত করা শুধু পারস্পরিকভাবে লাভজনক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুহূর্তের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ দশকের ধারাবাহিক আলোচনা ও চুক্তির অবস্থা থেকে এমন অবস্থায় চলে গেছে যেখানে কোনো চুক্তিই নেই—এবং নতুন চুক্তির সম্ভাবনাও স্পষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দল ‘নিউ স্টার্ট’ রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সেপ্টেম্বর মাসে চুক্তির সীমা এক বছর যৌথভাবে মানার প্রস্তাব দিলেও ট্রাম্প তা উপেক্ষা করেন।
এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন ঝুঁকির মুখে—যদি তাঁর নতুন প্রস্তাব ব্যর্থ হয়, তবে কী ঘটবে? ভালো চুক্তির আশায় প্রচলিত নিয়ম ভাঙার তাঁর প্রবণতারই আরেকটি উদাহরণ এই উদ্যোগ। কিন্তু প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়া ও ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতা করতে ব্যর্থ হওয়ার দৃশ্য বিশ্ব দেখেছে। নতুন প্রস্তাবটিও সমান দুঃসাহসী—এবং সম্ভবত আরও বিপজ্জনক।
ডব্লিউ. জে. হেনিগান জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও সংঘাত নিয়ে লিখে থাকেন। এই নিবন্ধটি দাতব্য সহায়তায় অর্থায়িত হলেও বিষয় নির্বাচন, সম্পাদনা বা প্রকাশে অর্থদাতাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; সম্পূর্ণ সম্পাদকীয় কর্তৃত্ব সংরক্ষিত।
ডব্লিউ. জে. হেনিগান 


















