হংকংয়ের প্রভাবশালী গণতন্ত্রপন্থী গণমাধ্যম উদ্যোক্তা জিমি লাইকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলে জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অপরাধে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বেইজিং বহু বছর ধরে যে প্রচেষ্টায় তার প্রভাব ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, এই রায় সেই প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নির্দেশ করে।
রায় ঘোষণার পর ৭৮ বছর বয়সী জিমি লাই আদালতের দর্শকসারির দিকে তাকিয়ে হাসেন ও হাত নাড়েন। তার স্ত্রী তেরেসা লাই নীরব ও স্থির ছিলেন, আর পেছনের সারি থেকে কান্নার শব্দ শোনা যায়। লাইয়ের মেয়ে ক্লেয়ার লাই এই রায়কে হৃদয়বিদারক ও নিষ্ঠুর বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, এই সাজা কার্যকর হলে তার বাবা কারাগারেই শহীদের মতো মৃত্যুবরণ করবেন।
বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ
গত ডিসেম্বর মাসে জিমি লাইকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তার বৈঠক এই অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠিত ও বর্তমানে বন্ধ হয়ে যাওয়া গণতন্ত্রপন্থী চীনা ভাষার পত্রিকা অ্যাপল ডেইলিতে রাষ্ট্রবিরোধী উপাদান প্রকাশের ষড়যন্ত্রের অপরাধেও দোষী সাব্যস্ত হন।
বিচারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ষড়যন্ত্রের মূল পরিকল্পনাকারী হওয়ায় তার জন্য কঠোর শাস্তি প্রাপ্য ছিল। তবে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস ও উচ্চ রক্তচাপসহ স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা বিবেচনায় নিয়ে তার সাজা ২৫ মাস কমানো হয়েছে।
সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি এই রায়কে গভীর সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করেন এবং লাইয়ের কর্মকাণ্ডকে জঘন্য ও নিন্দনীয় বলে বর্ণনা করেন। অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, জিমি লাই ন্যায্য বিচার পাওয়ার সুযোগই পাননি। বিচার শুরুর আগেই শহরের কমিউনিস্ট পার্টি–নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম তাকে দোষী ঘোষণা করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো এই রায়ের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, কারাগারে লাইয়ের স্বাস্থ্যগত সমস্যার যথাযথ চিকিৎসা নাও হতে পারে। মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য, ভিন্নমত দমনে আটক অবস্থায় মৃত্যুকে নীরব কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
রাজনীতি, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক চাপ
ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানবিক কারণে জিমি লাইকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি ব্রিটেন ও চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ মামলাকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে অন্য দেশগুলোকে সার্বভৌমত্ব সম্মান করার আহ্বান জানান।
মার্কিন নেতৃত্বও অতীতে লাইয়ের মুক্তির বিষয়ে চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে কথোপকথন চলমান রয়েছে বলেও কূটনৈতিক সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিস্তৃত দমননীতির প্রেক্ষাপট
জিমি লাইয়ের কঠোর সাজা চীনে ভিন্নমত দমন ও রাষ্ট্রের সমালোচকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বৃহত্তর ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবাধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী এমনকি ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের বিরুদ্ধেও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়ার নজির তৈরি হয়েছে।
একই দিনে অ্যাপল ডেইলির ছয়জন সাবেক কর্মীকেও ছয় থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক ও এক সম্পাদকীয় লেখক সবচেয়ে বেশি সাজা পেয়েছেন।
দারিদ্র্য থেকে উত্থানের গল্প
জিমি লাইয়ের জীবনগাথা হংকংয়ের পুঁজিবাদী সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিন আলোচিত ছিল। শৈশবে দরিদ্র চীন থেকে পালিয়ে এসে তিনি পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে নিজের পোশাক ব্র্যান্ড গড়ে তোলেন। সেই সাফল্যই তাকে গণমাধ্যম জগতে প্রবেশ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















