০৮:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
রমজানের আগে ঢাকায় ছোলা ও ফলের দাম উর্দ্ধমুখী ব্যাসুন্ধরা গ্রুপ ও ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ১,৩২৫ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি মামলার প্রস্তুতি মব কালচারের দিন শেষ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেসি জ্যাকসন, ও তার সারা জীবন শেয়ারের বাজারে ধস: ধস অব্যাহত, ডিএসইতে তৃতীয় দিনের পতন সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতার জন্য কূটনীতিকদের শক্তিশালী সমর্থন ঢাকায় বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম আবার কমলো: ২২ ক্যারেট ২৫৫,৫৫৮ টাকায় স্থির রমজানের আগেই সিলেটে দৈনন্দিন পণ্যের দাম উর্ধ্বগতি, সরকারি মূল্য তালিকা অগ্রাহ্য সাংবাদিকদের জন্য ভয়মুক্ত গণমাধ্যম পরিবেশ নিশ্চিত করবেন জহির উদ্দিন স্বপন ইরানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা: প্রতিবাদের মধ্যেও রয়ে গেছে আশা

মন্ত্রীদের শপথ বর্জন করে কি পুরোনো পথেই হাঁটলো বিরোধী দল?

  •  
  • ০৬:৩৫:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 18

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামী ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে।

মঙ্গলবার বিকেলে ওই শপথের কয়েক ঘণ্টা আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান।

কিন্তু সংসদেরই দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদ নেতা ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন মি. রহমান ও তার জোট।

এটিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বাংলাদেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সরকার-বিরোধী দলের পরস্পরকে ‘বর্জন’ বা ‘বয়কটের’ যে রাজনীতি তারই ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

আবার কেউ বলছেন, এ ঘটনায় ত্রয়োদশ সংসদের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা স্বস্তিকর হয়নি। তবে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ সামনে আসবে এবং তখন দেখার বিষয় হবে সেটি তারা কতটা কাজে লাগাতে পারে।

যদিও জাতীয় সংসদের উপনেতা মনোনীত হওয়া জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ বিএনপি নেয়নি বলেই প্রতিবাদ হিসেবে তারা শপথ অনুষ্ঠানে যাননি।

“এটি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ, একে পুরনো সংস্কৃতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আমরা দায়িত্বশীল বিরোধী দলই হবো,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

এর আগে মঙ্গলবার রাতেই এক বিবৃতিতে জামায়াতের আমির ও বিরোধিতা দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, “গণতন্ত্র কোনো একটি দিন বা একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; বরং এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা। আমরা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে সেই যাত্রা অব্যাহত রাখব ইনশাআল্লাহ”।

মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নিয়েছেন একই অনুষ্ঠানে
মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নিয়েছেন একই অনুষ্ঠানে

কী ঘটেছে মঙ্গলবার

বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনাদের কাছে পরাজিত হয়েছে তাদের পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোট। ভোটের ফল প্রকাশের পর জামায়াত জোটের দিক থেকে নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগও এসেছে।

কিন্তু সেই আলোচনা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছিল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াত ও তাদের জোটে থাকা এনসিপি ছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাতের পর।

ফলে মঙ্গলবার অনেকের ধারণা ছিল যে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে দেখা যাবে সংসদের বিরোধী দলকেও।

কিন্তু এর মধ্যে ওই দিনই সকালে তারেক রহমানসহ বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় অনেকটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসে জামায়াত ও এনসিপির দিক থেকে।

প্রথমে তারা শপথই নেবেন না- এমন বললেও পরে এমপি হিসেবে ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন তারা। শপথের পর জামায়াত জোটের সংসদীয় দলের সভায় শফিকুর রহমান বিরোধী দলীয় নেতা, সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের উপনেতা এবং নাহিদ ইসলাম বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত হন।

মূলত ওই বৈঠকেই বিএনপির সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলছেন, সব দল মিলে জাতির কাছে যে অঙ্গীকার করেছে বিএনপি তা থেকে সরে আসাতেই তারা এভাবে প্রতিবাদ করেছেন।

“জুলাই সনদ অনেকে আত্মত্যাগের মাধ্যমে এসেছে। আমরা সবাই তো একমত হয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপি শুরুতেই সেটি থেকে সরে গেছে। সে কারণেই আমাদের প্রতিবাদ ছিল শপথে না যাওয়া”।

মি. তাহের বলেন, এটিকে পুরোনো সংস্কৃতি হিসেবে না দেখে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবে দেখা উচিত।

“আমরা কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকাই রাখবো,” মন্তব্য করেন তিনি।

জামায়াত জোটের সংসদীয় দলের সভায় বক্তব্য রাখছেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান
জামায়াত জোটের সংসদীয় দলের সভায় বক্তব্য রাখছেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান

পুরোনো সংস্কৃতি কেন আলোচনায়

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিরোধী দলহীন সংসদ বানানোর অনেক উদাহরণ আছে, এমনকি ‘গৃহপালিত বিরোধী’ দলের তকমাও পেয়েছিল কোনো কোনো দল।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভায় তখনকার বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যকে ঠাঁই দেওয়ার পর ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে (২০২৪ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত) পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনাম ‘সংসদে বিরোধী দলের অপমৃত্যু’ শীর্ষক এক লেখায় এ প্রসঙ্গটি নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি ওই লেখায় লিখেছেন, “১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদের পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আগ পর্যন্ত সংসদে ‘বিরোধী দলের’ ইতিহাসকে মোটামুটি ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ ইতিহাস বলা যায়”।

আবার এর উল্টো চিত্রও দেখা গেছে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার পর। ওই সংসদে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ৮৮ জন সদস্য থাকায় তখন বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা সংস্কৃতি তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু তখন বিরোধী দলের নিয়মিত ওয়াক আউট, আর এক পর্যায়ে সংসদ বর্জনের কারণে সেই সংসদ আর শক্তিশালী বিরোধী দল পায়নি।

মাহফুজ আনাম তার লেখায় লিখেছেন, “বিরোধী দল হিসেবে পুরো পাঁচটি বছর আওয়ামী লীগ পার করে দেয় বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের প্রচেষ্টায় এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজনের দাবিতে। সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতায় মৌলিক অনুষঙ্গ হলো ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়মূলক ভূমিকা, যা ওই সংসদে একেবারেই হয়নি”।

এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া সরকার পদত্যাগ করলে ওই বছরেই ১২ই জুন সব দলের অংশগ্রহণে আরেকটি নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে ১০০ এরও বেশি আসন নিয়ে বিরোধী দলে যায় বিএনপি।

কিন্তু বিএনপিও আওয়ামী লীগের পথই অনুসরণ করে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তিক্ততা আরও বিস্তৃতি লাভ করে।

জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিতদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার
জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্যএবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে দুটি শপথই নিয়েছেন

এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে এবং ৬২টি আসন পেয়ে বিরোধী দলে যায় আওয়ামী লীগ।

“কিন্তু তারা কেবল অতীতের তিক্ততা ও ধ্বংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পুনরাবৃত্তিতে আগ্রহী ছিল। আমরা আবারও অন্তহীন ওয়াকআউট, বর্জন ও পদত্যাগ দেখতে পাই এবং সেবারও সংসদীয় ব্যবস্থাকে বলিষ্ঠ করার কোনো উদ্যোগ ছিল না,” লিখেছেন মাহফুজ আনাম।

এরপর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক তিক্ততা আরও চরমে ওঠে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০টির মতো আসন পেয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিলে সরকার ও দেশের প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা আরও বেড়ে যায়।

এরপরের তিনটি সংসদে বিএনপি ও সমমনাদের উপস্থিতি ছিল না। তখন জাতীয় পার্টি একাধারে বিরোধী দল আবার সরকারেরও অংশ হয়ে উঠেছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রের সংস্কৃতিতে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়নি, বরং ওয়াক আউট, বর্জন আর সব ইস্যুতেই বিরোধিতা নিয়মিত বিষয় ছিল।

“তখন এক দলের শপথে আরেক দল যেত না। সব কিছুতেই বিরোধিতা করতো। এবার সেটি আশা করিনি। কিন্তু এবারেও বিরোধী দল একই কাজ করলো। সবমিলিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা সুখকর হলো না। সংসদীয় রাজনীতিতে ট্রেজারি ও বিরোধী দলের সম্পর্কের যে ব্যত্যয় চলছিল দীর্ঘকাল সেই ধারাবাহিকতাই থাকলো”।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলছেন, বিরোধী দলের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথে না থাকা দুর্ভাগ্যজনক।

“এটি এতো আত্মত্যাগের পর মেনে নেওয়া কঠিন। তবে এটিই যে চিরস্থায়ী হবে সেটি এখনি বলতে চাইছি না। আশা করি সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পারিক দায়িত্বশীলতা সংসদ কার্যকর হয়ে উঠবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদও বলছেন যে, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার সুযোগ সামনে আসবে এবং তখনই দেখার বিষয় হবে সেই সুযোগ তারা কতটা গ্রহণ করতে পারেন।

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

রমজানের আগে ঢাকায় ছোলা ও ফলের দাম উর্দ্ধমুখী

মন্ত্রীদের শপথ বর্জন করে কি পুরোনো পথেই হাঁটলো বিরোধী দল?

০৬:৩৫:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামী ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে।

মঙ্গলবার বিকেলে ওই শপথের কয়েক ঘণ্টা আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান।

কিন্তু সংসদেরই দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদ নেতা ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন মি. রহমান ও তার জোট।

এটিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বাংলাদেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সরকার-বিরোধী দলের পরস্পরকে ‘বর্জন’ বা ‘বয়কটের’ যে রাজনীতি তারই ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

আবার কেউ বলছেন, এ ঘটনায় ত্রয়োদশ সংসদের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা স্বস্তিকর হয়নি। তবে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ সামনে আসবে এবং তখন দেখার বিষয় হবে সেটি তারা কতটা কাজে লাগাতে পারে।

যদিও জাতীয় সংসদের উপনেতা মনোনীত হওয়া জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ বিএনপি নেয়নি বলেই প্রতিবাদ হিসেবে তারা শপথ অনুষ্ঠানে যাননি।

“এটি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ, একে পুরনো সংস্কৃতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আমরা দায়িত্বশীল বিরোধী দলই হবো,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

এর আগে মঙ্গলবার রাতেই এক বিবৃতিতে জামায়াতের আমির ও বিরোধিতা দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, “গণতন্ত্র কোনো একটি দিন বা একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; বরং এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা। আমরা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে সেই যাত্রা অব্যাহত রাখব ইনশাআল্লাহ”।

মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নিয়েছেন একই অনুষ্ঠানে
মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নিয়েছেন একই অনুষ্ঠানে

কী ঘটেছে মঙ্গলবার

বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনাদের কাছে পরাজিত হয়েছে তাদের পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোট। ভোটের ফল প্রকাশের পর জামায়াত জোটের দিক থেকে নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগও এসেছে।

কিন্তু সেই আলোচনা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছিল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াত ও তাদের জোটে থাকা এনসিপি ছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাতের পর।

ফলে মঙ্গলবার অনেকের ধারণা ছিল যে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে দেখা যাবে সংসদের বিরোধী দলকেও।

কিন্তু এর মধ্যে ওই দিনই সকালে তারেক রহমানসহ বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় অনেকটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসে জামায়াত ও এনসিপির দিক থেকে।

প্রথমে তারা শপথই নেবেন না- এমন বললেও পরে এমপি হিসেবে ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন তারা। শপথের পর জামায়াত জোটের সংসদীয় দলের সভায় শফিকুর রহমান বিরোধী দলীয় নেতা, সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের উপনেতা এবং নাহিদ ইসলাম বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত হন।

মূলত ওই বৈঠকেই বিএনপির সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলছেন, সব দল মিলে জাতির কাছে যে অঙ্গীকার করেছে বিএনপি তা থেকে সরে আসাতেই তারা এভাবে প্রতিবাদ করেছেন।

“জুলাই সনদ অনেকে আত্মত্যাগের মাধ্যমে এসেছে। আমরা সবাই তো একমত হয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপি শুরুতেই সেটি থেকে সরে গেছে। সে কারণেই আমাদের প্রতিবাদ ছিল শপথে না যাওয়া”।

মি. তাহের বলেন, এটিকে পুরোনো সংস্কৃতি হিসেবে না দেখে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবে দেখা উচিত।

“আমরা কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকাই রাখবো,” মন্তব্য করেন তিনি।

জামায়াত জোটের সংসদীয় দলের সভায় বক্তব্য রাখছেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান
জামায়াত জোটের সংসদীয় দলের সভায় বক্তব্য রাখছেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান

পুরোনো সংস্কৃতি কেন আলোচনায়

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিরোধী দলহীন সংসদ বানানোর অনেক উদাহরণ আছে, এমনকি ‘গৃহপালিত বিরোধী’ দলের তকমাও পেয়েছিল কোনো কোনো দল।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভায় তখনকার বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যকে ঠাঁই দেওয়ার পর ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে (২০২৪ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত) পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনাম ‘সংসদে বিরোধী দলের অপমৃত্যু’ শীর্ষক এক লেখায় এ প্রসঙ্গটি নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি ওই লেখায় লিখেছেন, “১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদের পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আগ পর্যন্ত সংসদে ‘বিরোধী দলের’ ইতিহাসকে মোটামুটি ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ ইতিহাস বলা যায়”।

আবার এর উল্টো চিত্রও দেখা গেছে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার পর। ওই সংসদে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ৮৮ জন সদস্য থাকায় তখন বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা সংস্কৃতি তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু তখন বিরোধী দলের নিয়মিত ওয়াক আউট, আর এক পর্যায়ে সংসদ বর্জনের কারণে সেই সংসদ আর শক্তিশালী বিরোধী দল পায়নি।

মাহফুজ আনাম তার লেখায় লিখেছেন, “বিরোধী দল হিসেবে পুরো পাঁচটি বছর আওয়ামী লীগ পার করে দেয় বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের প্রচেষ্টায় এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজনের দাবিতে। সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতায় মৌলিক অনুষঙ্গ হলো ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়মূলক ভূমিকা, যা ওই সংসদে একেবারেই হয়নি”।

এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া সরকার পদত্যাগ করলে ওই বছরেই ১২ই জুন সব দলের অংশগ্রহণে আরেকটি নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে ১০০ এরও বেশি আসন নিয়ে বিরোধী দলে যায় বিএনপি।

কিন্তু বিএনপিও আওয়ামী লীগের পথই অনুসরণ করে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তিক্ততা আরও বিস্তৃতি লাভ করে।

জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিতদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার
জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্যএবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে দুটি শপথই নিয়েছেন

এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে এবং ৬২টি আসন পেয়ে বিরোধী দলে যায় আওয়ামী লীগ।

“কিন্তু তারা কেবল অতীতের তিক্ততা ও ধ্বংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পুনরাবৃত্তিতে আগ্রহী ছিল। আমরা আবারও অন্তহীন ওয়াকআউট, বর্জন ও পদত্যাগ দেখতে পাই এবং সেবারও সংসদীয় ব্যবস্থাকে বলিষ্ঠ করার কোনো উদ্যোগ ছিল না,” লিখেছেন মাহফুজ আনাম।

এরপর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক তিক্ততা আরও চরমে ওঠে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০টির মতো আসন পেয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিলে সরকার ও দেশের প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা আরও বেড়ে যায়।

এরপরের তিনটি সংসদে বিএনপি ও সমমনাদের উপস্থিতি ছিল না। তখন জাতীয় পার্টি একাধারে বিরোধী দল আবার সরকারেরও অংশ হয়ে উঠেছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রের সংস্কৃতিতে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়নি, বরং ওয়াক আউট, বর্জন আর সব ইস্যুতেই বিরোধিতা নিয়মিত বিষয় ছিল।

“তখন এক দলের শপথে আরেক দল যেত না। সব কিছুতেই বিরোধিতা করতো। এবার সেটি আশা করিনি। কিন্তু এবারেও বিরোধী দল একই কাজ করলো। সবমিলিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা সুখকর হলো না। সংসদীয় রাজনীতিতে ট্রেজারি ও বিরোধী দলের সম্পর্কের যে ব্যত্যয় চলছিল দীর্ঘকাল সেই ধারাবাহিকতাই থাকলো”।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলছেন, বিরোধী দলের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথে না থাকা দুর্ভাগ্যজনক।

“এটি এতো আত্মত্যাগের পর মেনে নেওয়া কঠিন। তবে এটিই যে চিরস্থায়ী হবে সেটি এখনি বলতে চাইছি না। আশা করি সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পারিক দায়িত্বশীলতা সংসদ কার্যকর হয়ে উঠবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদও বলছেন যে, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার সুযোগ সামনে আসবে এবং তখনই দেখার বিষয় হবে সেই সুযোগ তারা কতটা গ্রহণ করতে পারেন।

বিবিসি নিউজ বাংলা